বিশেষ সংবাদ

টুথপেস্টেই বিষের ফাঁদ? বাজারের ৭৬.৫ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক

টুথপেস্টেই বিষের ফাঁদ? বাজারের ৭৬.৫ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক

বিশেষ প্রতিবেদক

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কিংবা রাতে ঘুমানোর আগে দাঁত ব্রাশ করা আমাদের নিত্যদিনের অভ্যাস। কিন্তু সেই টুথপেস্টেই যদি লুকিয়ে থাকে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা—মাইক্রোপ্লাস্টিক—তাহলে তা শুধু উদ্বেগ নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের সতর্কসংকেত।

পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্ট নমুনার মধ্যে ২৬টিতে, অর্থাৎ ৭৬.৫ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। গবেষণাটি ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত হয় এবং রাজধানীতে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে উৎপাদিত ২৫টি নমুনার মধ্যে ২২টিতে, ভিয়েতনামের দুইটির দুটিতেই, থাইল্যান্ডের দুইটির একটিতে এবং ভারতের পাঁচটির একটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। দেশের বিভিন্ন সুপারশপ, খুচরা দোকান ও পাইকারি বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি (ইএইচই) ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। পাশাপাশি ২ হাজার ৭৬০ জন ভোক্তার ওপর জরিপ পরিচালিত হয়।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কেন ভয়ংকর?

মাইক্রোপ্লাস্টিক পাঁচ মিলিমিটারেরও ছোট প্লাস্টিক কণা, যা সহজেই মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় ইতোমধ্যে মানব রক্ত, ফুসফুস, যকৃত, প্লাসেন্টা এমনকি মস্তিষ্কের টিস্যুতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব কণা দীর্ঘমেয়াদে প্রদাহ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, প্রজনন সমস্যা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যদিও এ বিষয়ে আরও গবেষণা চলছে, তবুও সতর্কতার বিকল্প নেই।

শিশুদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি

দন্ত চিকিৎসকরা বলছেন, শিশুদের অনেকেই দাঁত ব্রাশ করার সময় টুথপেস্ট গিলে ফেলে। ফলে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকলে তা নিয়মিত শিশুর শরীরে প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি করে। তাই শিশুদের ব্যবহৃত টুথপেস্টের মান নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।

বিএসটিআইয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, বাজারে বিক্রি হওয়া টুথপেস্ট বিএসটিআইয়ের মান নিয়ন্ত্রণের আওতায় থাকলেও কীভাবে এত বিপুল সংখ্যক নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেল?

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যের মান পরীক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, নিয়মিত বাজার তদারকি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ এখন সময়ের দাবি।

পরিবেশের জন্যও বড় হুমকি

পরিবেশবিদরা বলছেন, টুথপেস্ট ব্যবহারের পর এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক ড্রেন হয়ে নদী-খাল ও সমুদ্রে পৌঁছে যায়। পরে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে আবার মানুষের শরীরেই ফিরে আসে। ফলে এটি শুধু স্বাস্থ্য নয়, পরিবেশগত সংকটও তৈরি করছে।

কোন ব্র্যান্ডে পাওয়া গেছে?

ইএসডিও গবেষণার সারসংক্ষেপ প্রকাশ করলেও সংবাদ সম্মেলনে সংশ্লিষ্ট সব ব্র্যান্ডের নাম প্রকাশ করা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, জনস্বার্থে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ও অনুত্তীর্ণ ব্র্যান্ডগুলোর নাম প্রকাশ করা প্রয়োজন, যাতে ভোক্তারা সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগও নিশ্চিত করা উচিত।

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ

বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন—

- টুথপেস্টসহ ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা।
- বিএসটিআই ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়মিত বাজার তদারকি জোরদার করা।
- প্রতিটি টুথপেস্টের উপাদান স্পষ্টভাবে লেবেলে উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা।
- শিশুদের জন্য আলাদা নিরাপত্তা মানদণ্ড প্রণয়ন।
- গবেষণায় শনাক্ত ঝুঁকিপূর্ণ ব্র্যান্ডগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।
- ভোক্তাদের সচেতন করতে জাতীয় পর্যায়ে প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা।

অনুসন্ধানের দাবি

এ গবেষণার ফলাফল নতুন করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—কোন প্রতিষ্ঠানগুলো এই পণ্য বাজারজাত করছে? উৎপাদনের সময় কী ধরনের কাঁচামাল ব্যবহার করা হচ্ছে? নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কতটা কার্যকরভাবে মান পরীক্ষা করছে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কোটি কোটি মানুষের প্রতিদিনের ব্যবহৃত একটি পণ্যে ক্ষতিকর উপাদান থাকার দায় কে নেবে?

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শুধুমাত্র একটি গবেষণার ফল নয়; এটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। তাই দ্রুত সরকারি তদন্ত, ব্র্যান্ডভিত্তিক তথ্য প্রকাশ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।