বিশেষ প্রতিনিধি:
মাদারীপুরের শকুনী লেক যেন এক অযত্নে ফেলে রাখা রত্নভাণ্ডার। তার বুকে অগাধ সম্ভাবনার ঢেউ, কিন্তু চারপাশে নীরবতার করুণ আলিঙ্গন। বছরের পর বছর জলের নিচে লুকিয়ে থাকা সোনালি স্বপ্নগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। একদিকে সবুজের সমারোহ, অন্যদিকে ভেতরে শুকনো হাহাকার। দীর্ঘদিন ইজারা না হওয়ায় এই লেক শুধু সরকারের কোষাগারকে নয়, স্থানীয় হাজারো পরিবারের ভাগ্যকেও অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়েছে। আর এই নীরব হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে একটি সরকারি চিঠি - ক্ষমতার কালো ছায়া যার নীরব সাক্ষী।
২০১৪ সালের জুন মাস। মাদারীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা পড়ে এক আবেদন। জনাব মোহাম্মদ এশরারুল হক নিলু, শহীদ সাইদ সুদুক, কাজী রফিকুল ইসলামসহ স্থানীয় উদ্যোক্তারা শকুনী লেকটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছ চাষের জন্য ইজারা চেয়েছিলেন। তাঁদের স্বপ্ন ছিল সহজ - লেককে উর্বর করে তোলা। আধুনিক মৎস্যচাষের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব বাড়বে, উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, আর স্থানীয় বেকার যুবক ও দরিদ্র মৎস্যজীবীরা পাবে স্থায়ী কর্মসংস্থান। যেন মরুভূমিতে ফুল ফোটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন তাঁরা।
কিন্তু স্বপ্ন দেখার পরই নেমে আসে ঝড়। সংযুক্ত সরকারি দলিলে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সেই করুণ বাস্তবতা। ভূমি মন্ত্রণালয়ের সায়রাত-১ শাখা থেকে জারি হয় চিঠি। অনুমোদিত সরকারি জলমহাল ইজারা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ফলে আবেদনটি কার্যত স্থগিত হয়ে যায়। যে লেকটি সোনার ফসলে ভরে উঠতে পারতো, তা হয়ে পড়ে অব্যবহৃত জলাধার - যেন প্রাণবন্ত এক নদীকে মাঝপথে বাঁধ দিয়ে শুকিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। জলের উপরিভাগ শান্ত, কিন্তু নিচে চাপা কান্না।
অভিযোগের আঙুল সরাসরি তৎকালীন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের দিকে। স্থানীয়দের দাবি, তাঁর প্রভাব খাটিয়েই মন্ত্রণালয় থেকে এমন চিঠি জারি করা হয় যা পুরো লিজ প্রক্রিয়াকে সমাধিস্থ করে দেয়। শাজাহান খানের বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি, আওয়ামী সরকার পতনের পরে বক্তব্য হয়ত আজ পাওয়াও যাবেনা । পেলে তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে। কিন্তু ফলাফল স্পষ্ট - বছরের পর বছর সরকারি রাজস্বের প্রবাহ বন্ধ, স্থানীয় অর্থনীতি পঙ্গু, আর পরিবেশগত ঝুঁকি বেড়েছে বহুগুণ।
জলাশয় ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বলেন, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত জলাশয় শুধু রাজস্ব হারায় না। এটি ধীরে ধীরে দখলদারদের লোভের শিকার হয়, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকা শুকিয়ে যায়। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ হলে যেখানে উৎপাদন বৃদ্ধি পেত, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো এবং সরকার নিয়মিত ইজারা মূল্য ও কর পেত, সেখানে আজ শুধুই শূন্যতা। লেকটি যেন একটি জীবন্ত প্রাণী - যাকে জাগালে এলাকার অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হতো, কিন্তু ক্ষমতার শকুনেরা তাকে ঘুমন্ত অবস্থাতেই গিলে ফেলেছে।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিবদের মতে, সরকারি সম্পত্তির ইজারা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত আইন, বিধিমালা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই নেওয়া উচিত। কোনো মন্ত্রী নীতিগত নির্দেশনা দিতে পারেন, কিন্তু যদি ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া থেকে বিচ্যুতি ঘটে, তাহলে তা প্রশাসনিক দুর্নীতির জন্ম দেয়। এখানে প্রশ্ন উঠেছে - সিদ্ধান্তটি জনস্বার্থে নেওয়া হয়েছিল, নাকি অন্য কোনো স্বার্থে? ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “এটি ক্ষমতার অপব্যবহার। তৎকালীন মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এর দায় এড়াতে পারেন না। দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।”
আবেদনকারী মোহাম্মদ এশরারুল হক নিলু ও মোহাম্মদ কাজী রফিকুল ইসলামের কণ্ঠে আজও সেই স্বপ্নের আলো জ্বলছে। তাঁরা বলেন, “সরকারি ওই আদেশ বাতিল করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মৎস্য খামার স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি করা হলে জাতীয় আমিষের চাহিদা পূরণে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে এলাকার দরিদ্র মৎস্যজীবীদের স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে এবং দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব।”
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় লিজ বন্ধ থাকায় সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট হিসাবের জন্য আনুষ্ঠানিক নিরীক্ষা প্রয়োজন। তদন্তে উঠে আসা প্রশ্নগুলো এখন জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার দাবি রাখে - কোন আইনি ভিত্তিতে লিজ স্থগিত করা হয়েছিল? চিঠিটি বাধ্যতামূলক নির্দেশ ছিল নাকি মতামত? জেলা প্রশাসন কেন সেটি অনুসরণ করেছিল? লেকটি বর্তমানে কার দখলে? কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে কি না?
শকুনী লেক আজ শুধু একটি জলাশয় নয়। এটি সুশাসনের, স্বচ্ছতার এবং জনস্বার্থের এক মর্মান্তিক পরীক্ষা। সরকারি দলিলগুলোই প্রমাণ করছে কীভাবে একটি সিদ্ধান্ত পুরো এলাকার ভাগ্যকে অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে। এখন সময় হয়েছে স্বচ্ছ তদন্তের। মন্ত্রণালয়ের পুরো ফাইল, নোটশিট, ভূমি রেকর্ড-খতিয়ান, দখলদারদের পরিচয় এবং প্রকৃত রাজস্ব ক্ষতির হিসাব বের করতে হবে।
না হলে শকুনী লেকের মতো আরও অনেক সম্পদ ক্ষমতার শকুনদের পেটে চলে যাবে। সাধারণ মানুষের স্বপ্ন চিরতরে ডুবে থাকবে অন্ধকার জলে। আর দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের পথে পড়ে থাকবে অজস্র অব্যবহৃত রত্নভাণ্ডার। শকুনী লেকের এই করুণ কাহিনি শুধু একটি লেকের গল্প নয় - এটি আমাদের শাসনব্যবস্থার আয়না।
(পরবর্তী অনুসন্ধানে: লেকের বর্তমান দখল, ভূমি রেকর্ড, মন্ত্রণালয়ের ফাইল নোটিং, লিজ বিধিমালা ও দায়ীদের পরিচয়)