রংপুর ব্যুরো
উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে আধুনিক, নিরাপদ ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে একগুচ্ছ তাৎক্ষণিক ও স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। উদ্যোগের অংশ হিসেবে আগামী দুই মাসের মধ্যে আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ১০ থেকে বাড়িয়ে ২০ করা, হাসপাতালজুড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প ও পুলিশ কন্ট্রোল রুম চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির দীর্ঘ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য (মন্ত্রী) অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু, এমপি।
তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চলের দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও নানা সংকটের কারণে হাসপাতালের সেবার মান ব্যাহত হয়েছে। এসব সমস্যা ধাপে ধাপে সমাধান করে হাসপাতালটিকে জনগণের আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হবে।
অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু জানান, আগামী দুই মাসের মধ্যে বিদ্যমান ১০টি আইসিইউ শয্যার সঙ্গে আরও ১০টি শয্যা যুক্ত করে মোট ২০টি আইসিইউ শয্যা চালু করা হবে। একই সঙ্গে কেবিনে ভর্তি রোগীদের সঙ্গে একজন স্বজন থাকার সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অস্ত্রোপচার কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে অ্যানেস্থেশিয়াসংক্রান্ত সংকট দ্রুত নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জরুরি অস্ত্রোপচার কোনো অবস্থাতেই ব্যাহত হতে দেওয়া হবে না।
হাসপাতালে লাশ পরিবহনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, অ্যাম্বুলেন্স সেবায় শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা আনতে নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা প্রণয়ন, তালিকাভুক্ত অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনা এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন ও মালিকপক্ষের সমন্বয়ে একটি কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।
নিরাপত্তা জোরদারে আগামী এক মাসের মধ্যে হাসপাতালের পুরো এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি আগামী সাত দিনের মধ্যে হাসপাতাল চত্বরে উচ্চক্ষমতার আলোকসজ্জা স্থাপন করা হবে। রোগী ও স্বজনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে একটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প ও পুলিশ কন্ট্রোল রুম চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
হাসপাতাল চত্বরে জলাবদ্ধতা নিরসন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং অননুমোদিত প্রবেশপথ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সেবায় শৃঙ্খলা আনতে হাসপাতালের সব কর্মচারীর জন্য পরিচয়পত্র বা ফেস কার্ড বাধ্যতামূলক করা হবে। একই সঙ্গে রোগীর একজন স্বজনকে অ্যাটেনডেন্ট কার্ড দেওয়া হবে, যাতে তাঁরা নির্বিঘ্নে হাসপাতালে অবস্থান করতে পারেন।
আউটসোর্সিং কর্মীর সংকট দূর করতে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য কমবে এবং রোগীদের হয়রানি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, আনসার সদস্যদের কাজে বাধা দেওয়া কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার মতো ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হবে।
স্বাস্থ্যসেবায় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, “অসুস্থ, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কোনো রাজনীতি নেই। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা প্রত্যেক মানুষ সমান সেবা পাওয়ার অধিকারী। চিকিৎসাসেবায় কোনো ধরনের বৈষম্য বা রাজনৈতিক প্রভাব গ্রহণযোগ্য নয়।”
তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও জনবল সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বর্তমান সরকার স্বাস্থ্যখাতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে শূন্য পদগুলোতে দ্রুত নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং শিগগিরই তাঁকে নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিদর্শন শেষে চিকিৎসক, নার্স ও হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রোগীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সেবা প্রদানের আহ্বান জানান তিনি। অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, দীর্ঘদিনের সমস্যা একদিনে সমাধান সম্ভব নয়। তবে পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিটি সমস্যার সমাধান করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য একটি আধুনিক, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হবে।
পরিদর্শন ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রংপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও রংপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম সাইফুল, সংসদ সদস্য বেলাল হোসেন, সংসদ সদস্য সামসুজ্জামান সামু, হাসপাতালের পরিচালক, ঊর্ধ্বতন চিকিৎসক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।