সৌদি আরব প্রতিনিধি:
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। হামাস মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় তৈরি এক চুক্তির অধীনে অস্ত্র সমর্পণের প্রক্রিয়া শুরু করতে রাজি হয়েছে বলে ঘোষণা দিলেও ইসরায়েল এতে গুরুতর নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একই সময়ে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং এতে একাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, তেল আবিব হোয়াইট হাউসের কাছে এই নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি নিয়ে তাদের গুরুতর উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। ইসরায়েলি গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুসারে হামাস প্রকৃতপক্ষে নিরস্ত্রীকরণের পরিবর্তে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। ইসরায়েল স্পষ্ট করেছে যে হামাস সম্পূর্ণভাবে অস্ত্র সমর্পণ না করা পর্যন্ত গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। বর্তমানে ইসরায়েলি বাহিনী গাজার ৬০ শতাংশেরও বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলেছেন, হামাসকে আগে সরিয়ে না নিয়ে সেনা পুনঃমোতায়েন করা হলে তারা দ্রুত গাজাজুড়ে তাদের উপস্থিতি বাড়াবে, সন্ত্রাসী অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করবে এবং আবারও ইসরায়েলি সম্প্রদায়ের ওপর হুমকি তৈরি করবে। তাদের মতে নিরস্ত্রীকরণ মানে শুধু অস্ত্র হস্তান্তর নয়, বরং ভৌতভাবে অস্ত্র ত্যাগ করা। কিছু সূত্রে জানা গেছে, ইসরায়েল চায় কাতার ও তুরস্ক এই চুক্তির যাচাই প্রক্রিয়ায় জড়িত না থাকুক এবং বাজেয়াপ্ত অস্ত্র ধ্বংস করা হোক।
হামাস এর আগে জানিয়েছিল যে তারা এই রোডম্যাপ মেনে চলবে এবং অস্ত্র সমর্পণের প্রক্রিয়া শুরু করবে। তবে তারা বলেছে যে ইসরায়েলকেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী হামলা বন্ধ ও ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। হামাসের দাবি, ইসরায়েল যদি তাদের অংশ পালন না করে তাহলে তারাও চুক্তি মানবে না। চুক্তিটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে এবং এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন ও ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনী গঠনের বিষয়ও যুক্ত রয়েছে।
এই কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই গাজায় ইসরায়েলি বিমান ও ড্রোন হামলা চলছে। রোববার ভোর থেকে গাজা সিটি, দৈর আল-বালাহ ও খান ইউনিসসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলায় অন্তত ১৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে গাজার সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে। নিহতদের মধ্যে শিশু ও নারীও রয়েছেন। হামলাগুলোতে আবাসিক ভবন, তাঁবু এবং যানবাহন লক্ষ্য করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করেছে। কিছু হামলায় হামাসের কমান্ডারসহ অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুকে নিশানা করা হয়েছে বলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী যুদ্ধবিরতি চালু হওয়ার পর থেকেও হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়েছে। সামগ্রিকভাবে অক্টোবর ২০২৩ সালের পর থেকে গাজায় নিহতের সংখ্যা সাতাত্তর হাজারের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে তাদের দাবি। হামাস মধ্যস্থতাকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা ইসরায়েলকে চুক্তি মেনে হামলা বন্ধ করতে চাপ দেয়।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরেও এই চুক্তি নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কিছু দূর-ডানপন্থী মন্ত্রী চুক্তির বিরোধিতা করেছেন এবং হামলা অব্যাহত রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসন এই চুক্তিকে যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেখছে এবং উভয় পক্ষকে এর বাস্তবায়নে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছে। তবে বাস্তবে নিরস্ত্রীকরণের যাচাই প্রক্রিয়া, অস্ত্র ধ্বংস এবং সেনা প্রত্যাহারের সময়সূচি নিয়ে এখনও বড় ফাঁক রয়ে গেছে।
গাজার বাসিন্দারা এই পরিস্থিতিতে আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। একদিকে চুক্তির আশা, অন্যদিকে চলমান হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ তাদের জীবনকে কঠিন করে তুলছে। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন, কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা দেখাচ্ছে যে আস্থাহীনতা এখনও প্রবল। ইসরায়েল চায় সম্পূর্ণ ও যাচাইযোগ্য নিরস্ত্রীকরণ, আর হামাস চায় ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার ও হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা। এই দুই দাবির মধ্যে সেতুবন্ধন না হওয়া পর্যন্ত গাজায় স্থিতিশীলতা ফিরে আসা কঠিন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।