ইউএসএ প্রতিনিধি:
গ্রীষ্মের তীব্র তাপপ্রবাহ ও শক্তিশালী বাতাসের কারণে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় দাবানল ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গ্রিসে এথেন্সের কাছে অগ্নিনির্বাপণ অভিযানের সময় দুটি হেলিকপ্টারের সংঘর্ষে দুই ক্রু সদস্য নিহত হয়েছেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন রাজ্যের স্পোকেন এলাকায় দাবানল ছড়িয়ে পড়ে প্রায় ছয়শো স্থাপনা পুড়েছে এবং ষাট হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দুই মহাদেশেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে, তবে আবহাওয়ার প্রতিকূলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
গ্রিসে রোববার এথেন্সের পশ্চিমে সাইটার কাছে সাইথা এলাকায় দাবানল নেভাতে দুটি ভাড়া করা বেল হেলিকপ্টার মাঝামাঝি আকাশে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। একটি হেলিকপ্টারের রোটর অন্যটিতে আঘাত করে এবং সেটি আগুনে পুড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। অন্য হেলিকপ্টারটি জরুরি অবতরণ করে। সংঘর্ষে একজন ড্যানিশ পাইলট ও একজন গ্রিক অগ্নিনির্বাপণ সমন্বয়ক নিহত হন। অন্য হেলিকপ্টারের ব্রিটিশ পাইলট ও একজন গ্রিক কর্মকর্তা বেঁচে যান এবং তাঁদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ঘটনার পর সব বেল হেলিকপ্টারকে মাটিতে নামিয়ে রাখা হয়েছে।
এই দুর্ঘটনা ঘটেছে এমন এক সময়ে যখন গ্রিস একাধিক দাবানলের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। এথেন্সের উত্তর-পশ্চিমে পোর্তো জারমেনো এলাকায় আগুন শত শত বাড়িঘর পুড়িয়েছে এবং শহরের উপকণ্ঠের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শক্তিশালী বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। প্রায় পাঁচশো অগ্নিনির্বাপক ও একাধিক বিমান ও হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে। পেলোপনেজ উপদ্বীপ ও কেফালোনিয়া দ্বীপেও নতুন করে আগুন ধরেছে। প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোতাকিস এই মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং দেশের জন্য অত্যন্ত কঠিন দিন চলছে বলে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, এত জোরে বাতাস বইলে বিমান সম্পদও নিরাপদে কাজ করতে পারে না।
ইউরোপের অন্যান্য দেশেও দাবানলের পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। স্পেন ও ফ্রান্সে গত সপ্তাহে বড় আকারের আগুন লাগলেও সেখানে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতে শুরু করেছে। তবে গ্রিসে এখনও একাধিক ফ্রন্টে লড়াই চলছে। তাপপ্রবাহ ও শুষ্ক আবহাওয়া আগুনের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং অনেক বাড়িঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
এদিকে আটলান্টিকের ওপারে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন রাজ্যেও দাবানল ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর স্পোকেন ও আশেপাশের এলাকায় একাধিক আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। ওল্ড ট্রেইলস ফায়ারসহ কয়েকটি দাবানল মিলে হাজার হাজার একর এলাকা পুড়িয়েছে। শক্তিশালী বাতাসের কারণে আগুন স্পোকেন নদী পার হয়ে শহরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী অন্তত ছয়শো স্থাপনা পুড়ে গেছে। এর মধ্যে বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য কাঠামো রয়েছে।
স্পোকেন এলাকায় প্রায় ষাট হাজার মানুষকে জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। লেভেল থ্রি অর্থাৎ ‘এখনই চলে যান’ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বেশ কয়েকটি এলাকায়। ভেটেরান্স অ্যাফেয়ার্স হাসপাতালের রোগীদেরও স্থানান্তর করা হয়েছে। শহরের কনভেনশন সেন্টারে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। রাজ্যপাল জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন এবং বন্যা ও আগুনের বিপদকে মোকাবিলায় সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বাতাসের গতি ঘণ্টায় পঁয়তাল্লিশ মাইল পর্যন্ত উঠে যাওয়ায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্পোকেনের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় অনেক বাসিন্দা রাতারাতি ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। রাস্তায় যানজট তৈরি হয়েছে এবং ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে গেছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা বলেছেন, আবহাওয়া ও ভূখণ্ড দুটোই তাদের বিপক্ষে কাজ করছে। আগুন এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি এবং আরও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে একাধিক দাবানল চলছে এবং অগ্নিনির্বাপণ সংস্থার ওপর চাপ বেড়েছে।
দুই মহাদেশের এই দাবানলগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, শুষ্ক বনভূমি ও শক্তিশালী বাতাস আগুনকে দ্রুত ছড়াতে সাহায্য করছে। গ্রিসে হেলিকপ্টার সংঘর্ষের ঘটনা অগ্নিনির্বাপণ কাজে নিয়োজিত বিমান চালকদের ঝুঁকিকে স্পষ্ট করে তুলেছে। অন্যদিকে স্পোকেনের ঘটনা দেখিয়েছে কীভাবে শহরাঞ্চল পর্যন্ত আগুন পৌঁছে যেতে পারে এবং হাজার হাজার মানুষকে ঘরছাড়া করতে পারে।
অগ্নিনির্বাপকরা উভয় স্থানেই অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন। গ্রিসে বিদেশি সহায়তাও এসেছে এবং আরও বিমান ও হেলিকপ্টার মোতায়েনের চেষ্টা চলছে। ওয়াশিংটনে স্থানীয়, রাজ্য ও ফেডারেল সংস্থাগুলো যৌথভাবে কাজ করছে। তবে আবহাওয়ার উন্নতি না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
এই দুই ঘটনা একসঙ্গে দেখাচ্ছে যে দাবানল এখন শুধু বনভূমির সমস্যা নয়, বরং শহর, বাড়িঘর ও মানুষের জীবনযাত্রাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে। গ্রিসে নিহত ক্রু সদস্যদের পরিবারের প্রতি শোক এবং ওয়াশিংটনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা এবং ভবিষ্যতে এমন ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।