স্পেন প্রতিনিধি:
উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের ছোট ছিটমহল সেউতা গত সপ্তাহে অভূতপূর্ব এক মানবিক ও সীমান্ত সংকটের মুখোমুখি হয়। বৃহস্পতিবার ভোর থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক দিনে মরক্কো থেকে প্রায় পঞ্চাশ থেকে ষাট হাজার মানুষ স্থল ও সমুদ্রপথে এই স্প্যানিশ ভূখণ্ডে প্রবেশ করে। এদের অধিকাংশই তরুণ মরক্কান পুরুষ। সেউতার স্বাভাবিক জনসংখ্যা প্রায় চুয়ান্ন হাজারের কাছাকাছি। হঠাৎ করে এত বড় সংখ্যক মানুষের প্রবেশে শহরটির জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দাদের জন্য চরম চাপের সৃষ্টি হয়।
অভিবাসীরা মূলত তারাহাল সৈকত ও আশেপাশের ভাঙা বেড়া এবং সমুদ্রের ভাঙা বাঁধ ঘিরে প্রবেশের চেষ্টা করে। অনেকে সাঁতরে, কেউ কেউ ভাসমান বস্তু ব্যবহার করে, আবার কেউ বেড়া টপকে বা ফাঁক দিয়ে ঢোকার চেষ্টা চালায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব ও ভুল তথ্য অনেককে উৎসাহিত করেছিল বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। মরক্কোর অর্থনৈতিক কষ্ট এবং ইউরোপে ভালো জীবনের আশা অনেক তরুণকে এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দেয়। স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক এক রায়ের ভুল ব্যাখ্যাও কিছু মানুষকে উৎসাহিত করেছিল বলে স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ মনে করে।
প্রথম দিনেই হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। স্প্যানিশ পুলিশ ও সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খায়। শহরের রাস্তাঘাট, পার্ক ও সৈকতে অভিবাসীদের ভিড় জমে যায়। স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। অনেক বাসিন্দা বাড়ির দরজা বন্ধ রেখে ভয়ে থাকেন। একই সময়ে অনেক অভিবাসীকে খাবার ও পানীয় সরবরাহ করতে স্প্যানিশ সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো তৎপর হয়।
মৃত্যুর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অন্তত বাহাত্তর জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কেউ কেউ সমুদ্রে ডুবে মারা যান, আবার কেউ বেড়া বা ভাঙা বাঁধ টপকানোর সময় পদদলিত হয়ে নিহত হন। কিছু সূত্রে মরক্কোর পাশেও মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় মর্গে মরদেহের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে সেউতার স্থানীয় নেতা জানিয়েছেন। মরক্কোর অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয় তাদের পক্ষ থেকে এগারো জনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে। এই মৃত্যুগুলো মূলত ডুবে মরার কারণে হয়েছে বলে তারা দাবি করেছে।
সঙ্কট শুরুর দুই দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রায় আটচল্লিশ হাজারের বেশি মানুষ স্বেচ্ছায় মরক্কোতে ফিরে গেছেন। সেনা ও পুলিশের সহায়তায় অনেককে সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয়। মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনীও তাদের পাশে সহযোগিতা করে। শুক্রবার সন্ধ্যা নাগাদ বেশিরভাগ অভিবাসীই ফিরে যান। সপ্তাহান্তে আরও কিছু মানুষ স্বেচ্ছায় বা কর্তৃপক্ষের সহায়তায় মরক্কোতে ফিরে যান। তবে কয়েক শত মানুষ এখনও সেউতায় রয়ে গেছেন। কেউ কেউ পাহাড়ি এলাকায় লুকিয়ে আছেন, আবার কেউ সৈকতে আশ্রয় নিয়েছেন এবং ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পেন বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। শনিবার তারাহাল সৈকতের কাছে পাঁচশো মিটার দীর্ঘ ভাসমান বাধা স্থাপন করা হয়। এই নিউমেটিক ব্যারিয়ার পানির উপরে ত্রিশ থেকে সত্তর সেন্টিমিটার এবং নিচে এক মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত থাকতে পারে। এর সঙ্গে নোঙর করা বয়ার সারি যোগ করা হয়েছে যাতে নৌবাহিনীর টহল সহজ হয়। অতিরিক্ত সেনা ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। প্রায় তিন হাজার নিরাপত্তা কর্মী এখনও শহরে মোতায়েন রয়েছেন এবং প্রয়োজন অনুসারে আরও সময় থাকবেন বলে সরকার জানিয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও তীব্র হয়েছে। দূর-ডানপন্থী দল ভক্সের নেতা সান্তিয়াগো আবাসকাল সেউতায় গিয়ে পরিস্থিতিকে ‘আক্রমণ’ বলে বর্ণনা করেন এবং স্প্যানিশ সরকারকে দায়ী করেন। তিনি সীমান্তের স্থায়ী সামরিকীকরণের দাবি জানান। মূল বিরোধী দল পিপলস পার্টির নেতাও শহরে গিয়ে সরকারের নীতির সমালোচনা করেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই অস্থিরতায় ভুগছেন, আবার কেউ কেউ বলছেন যে অভিবাসীরা তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিলেন এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারত। কিছু বাসিন্দা দূর-ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের উপস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও করেছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বাইশটি সদস্য রাষ্ট্র সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে চিঠি দিয়েছে। ইতালি স্পেনের সঙ্গে শেঙেন চুক্তির কিছু সুবিধা সাময়িকভাবে স্থগিত করার কথা বলেছে। ফ্রান্সও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডের লেয়েন ঘটনাটিকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সেউতা সফর করে এটিকে স্পেনের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেন এবং ইউরোপীয় সহযোগিতার অভাবের সমালোচনা করেন।
মরক্কো এই সংকটের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব, মানবপাচার চক্র এবং ভুল তথ্যকে দায়ী করেছে। তারা বলেছে যে তারা স্পেনের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। স্প্যানিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মরক্কোর সহযোগিতার প্রশংসা করেছেন। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন যে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের জটিলতা এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এই ধরনের ঘটনাকে উসকে দিতে পারে।
এখন সেউতা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। দোকানপাট খুলতে শুরু করেছে, মানুষ রাস্তায় বের হচ্ছে। তবুও কয়েক শত অভিবাসী এখনও শহরে রয়ে গেছেন এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। কিছু তরুণ এখনও পাহাড়ে লুকিয়ে আছেন বা সৈকতে অপেক্ষা করছেন। কর্তৃপক্ষ তাদের চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে স্পেন নতুন বাধা এবং টহল ব্যবস্থার মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধ করার চেষ্টা করছে।
এই সংকট ইউরোপের অভিবাসন নীতি নিয়ে আবারও বিতর্ক তৈরি করেছে। একদিকে মানবিক দায়িত্ব, অন্যদিকে সীমান্ত নিরাপত্তা ও স্থানীয় সক্ষমতার প্রশ্ন উঠেছে। সেউতার মতো ছোট শহর হঠাৎ করে এত বড় চাপ সামলাতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেক তরুণ মরক্কান তাদের দেশে কর্মসংস্থানের অভাবে এই পথ বেছে নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এখন ফিরে গিয়ে বলছেন যে এভাবে জীবন ঝুঁকিতে ফেলা ঠিক নয়। আবার কেউ কেউ এখনও ইউরোপের স্বপ্ন দেখছেন।
সেউতার এই ঘটনা দেখিয়েছে যে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, তথ্যের সঠিক প্রচার এবং দুই দেশের মধ্যে সমন্বয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ভাসমান বাধা ও অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন সাময়িক সমাধান হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সুযোগ ও স্থিতিশীলতার অভাবই এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে রয়ে যাবে। স্পেন ও মরক্কো উভয়কেই এখন এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এমন সংকট এড়াতে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।