নিজস্ব প্রতিবেদক:
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দুবাই থেকে ফেরত আনতে বাংলাদেশ সরকার আইনি ও কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। সম্প্রতি দুবাইয়ের আদালত তাঁকে শর্তসাপেক্ষে জামিন দিয়েছে। পাসপোর্ট আদালতের হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং অনুমতি ছাড়া তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত ছাড়তে পারবেন না। সরকার জামিন বাতিলের জন্য ল’ফার্ম নিয়োগ করেছে এবং প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে চাইছে। একসময়ের ক্ষমতাধর এই ব্যক্তি এখন আইনি জটিলতার ফাঁদে আটকে আছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ—দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, জমি দখল, মানিলন্ডারিং, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন।
ক্ষমতার চূড়া থেকে পতনের গল্প
বেনজীর আহমেদ ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত র্যাবের মহাপরিচালক এবং ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাঁকে ‘মুকুটহীন রাজপুত্র’ বলা হতো। ক্ষমতার ছায়ায় গড়ে উঠেছিল বিশাল সম্পদের সাম্রাজ্য। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি আমূল পাল্টে যায়। তিনি সরকারের লেজুড়বৃত্তি থেকে সরকারের বিরাগভাজন হয়ে ওঠেন। দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু হলে ২০২৪ সালের ৪ মে তিনি পরিবারসহ দেশ ত্যাগ করেন। ইন্টারপোল রেড নোটিসের পর ২০২৬ সালের ১২ জুন দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হন।
বিলাসী জীবন ও সম্পদের পাহাড়
দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, বেনজীর ও তাঁর পরিবারের নামে শত শত বিঘা জমি, গুলশানের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, রিসোর্ট, কোম্পানির শেয়ার এবং বিদেশে সম্পত্তি রয়েছে। গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে প্রায় ৬০০ বিঘার বেশি জমি কিনে গড়ে তোলা হয়েছে সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক। অধিকাংশ জমি স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ক্রয় করা হয়েছে বলে অভিযোগ। ভুক্তভোগীরা দাবি করেন, ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগ করে জমি কেনা হয়েছে। গাজীপুরে ভাওয়াল রিসোর্টে শেয়ার, পূর্বাচলে ভিলা, কক্সবাজার ও সেন্ট মার্টিনে জমি—সবই ক্ষমতায় থাকাকালীন অর্জিত। স্ত্রী জিসান মির্জার নামেই অধিকাংশ জমি রয়েছে। গুলশানের র্যাঙ্কন আইকন টাওয়ারে চারটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব, ১৯টি কোম্পানির শেয়ার এবং সঞ্চয়পত্র রয়েছে। দুদকের হিসাবে শুধু জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের পরিমাণই কয়েক ডজন কোটি টাকা। আদালত এসব সম্পদ জব্দ ও ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের নির্দেশ দিয়েছে।
গুম-খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ
র্যাব প্রধান থাকাকালীন বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র র্যাব এবং ছয়জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বেনজীর আহমেদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগে বলা হয়, ২০০৯ সাল থেকে ৬০০-এর বেশি গুম এবং ২০১৮ সাল থেকে প্রায় ৬০০ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে র্যাব জড়িত। কক্সবাজারের টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হকের হত্যাকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড এবং র্যাবের টিএফআই সেলে গুমের মামলায় তিনি আসামি।
দুদকের মামলা ও অন্যান্য অভিযোগ
দুদক তাঁর বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা করেছে। এর মধ্যে একটি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে এবং বিচার চলছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তিনি প্রায় ১১ থেকে ১৪ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন। স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধেও পৃথক মামলা রয়েছে। পাসপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগও আছে—তিনি পুলিশ পরিচয় গোপন করে প্রাইভেট সার্ভিস কর্মচারী হিসেবে পাসপোর্ট নিয়েছেন বলে অভিযোগ। ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রির অভিযোগও উঠেছে।
দুবাইয়ে আইনি মারপ্যাচ
UAE-এর ফেডারেল আইন নং ৩৯ অফ ২০০৬ অনুযায়ী প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া চলছে। বাংলাদেশ ও UAE-এর মধ্যে সরাসরি প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকায় প্রক্রিয়া জটিল। গ্রেপ্তারের পর ৩০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জমা দিতে হয়। সরকার নথি পাঠিয়েছে। কিন্তু জামিন মঞ্জুর হওয়ায় ফেরত আনা বিলম্বিত হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, সরকার সব আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং আশা করছে শিগগিরই তাঁকে দেশে ফেরানো যাবে। দুদকও বলেছে, তাদের পক্ষ থেকে কোনো অবহেলা হয়নি।
একসময়ের প্রভাবশালী এই ব্যক্তি এখন আইনি মারপ্যাচে আটকে। দুর্নীতির বরপুত্র হিসেবে পরিচিত বেনজীরের প্রত্যাবর্তন কি সম্ভব হবে, নাকি আইনি জটিলতাই তাঁর রক্ষাকবচ হয়ে থাকবে—সে প্রশ্ন এখন সবার মুখে। সরকারের লড়াই চলছে, কিন্তু ফলাফল এখনো অনিশ্চিত। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।