নিজস্ব প্রতিবেদক:
স্পেনের উত্তর আফ্রিকার ছোট্ট অঞ্চল সেউতায় গত কয়েকদিনে যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা আধুনিক ইউরোপের মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছে। মরক্কো থেকে হাজার হাজার অভিবাসী একসঙ্গে সীমান্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব—‘সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়েছে’—তাদের ঠেলে দিয়েছে মৃত্যুর দিকে। স্পেনীয় কর্তৃপক্ষের হিসাবে অন্তত ৮৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। মরক্কোর প্রাথমিক হিসাব ছিল ১১ জন। অধিকাংশ মানুষই ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে স্বেচ্ছায় ফিরে গেছেন। কিন্তু যারা ফিরে যাননি, তাদের লাশ এখনো সমুদ্র ও কাঁটাতারের দুই পাশে পড়ে আছে।
গুজবের ফাঁদে হাজার হাজার জীবন
ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও টিকটকে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া খবর হাজার হাজার মানুষকে সেউতার দিকে টেনে আনে। অনুমান করা হচ্ছে, প্রায় ৬০ হাজার মানুষ সীমান্ত এলাকায় জড়ো হয়েছিলেন। স্পেনীয় সেনা ও সিভিল গার্ড দ্রুত নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনে। অধিকাংশ মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এই ‘ফেরত’ পাঠানোর প্রক্রিয়ায়ই ঘটেছে মানবতার বড় ধরনের পতন। ভিড়ের চাপে, জলে ডুবে, কাঁটাতারে আটকে ও পদদলিত হয়ে মানুষ মারা গেছেন। শিশু, নারী ও বৃদ্ধ—কেউই রেহাই পাননি।
ইউরোপের ‘মানবতাবাদী’ মুখোশ খসে পড়ল
যে ইউরোপ নিজেকে মানবাধিকারের আলোকবর্তিকা বলে দাবি করে, সেই ইউরোপই আজ সীমান্তে মানবতা হত্যা করছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডের লায়েন শক্তিশালী সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের পাঁচটি ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে—যার মধ্যে রয়েছে আরও বেশি মানুষকে ফেরত পাঠানো।
ইতালি স্পেনের সঙ্গে শেনজেন চুক্তি এক মাসের জন্য স্থগিত করেছে। অন্যান্য ইইউ সদস্যরাও ‘জরুরি ব্যবস্থা’ দাবি করছে। মানবতাবাদী স্লোগান একদিকে, অন্যদিকে সীমান্তে দেয়াল, সেনা ও মৃত্যু—এই দ্বৈত নীতিই আজকের ইউরোপের আসল চেহারা।
মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে টানাপোড়েন, কিন্তু লাশ তো লাশই
স্পেন বলছে ৮৮ জন নিহত। মরক্কো বলছে ১১ জন। দুই পক্ষই এখন লাশ শনাক্তকরণে কাজ করছে। কিন্তু সংখ্যা যাই হোক, প্রতিটি লাশই প্রমাণ করে যে ইউরোপের ‘মানবিক’ অভিবাসন নীতি আসলে মৃত্যু ফাঁদ। যারা সীমান্ত পেরিয়ে ইউরোপে প্রবেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তারা পেয়েছেন শুধু জল, কাঁটাতার ও গুলির হুমকি। স্থানীয় বাসিন্দারা এখনো শঙ্কায়। সেউতার নেতা মরক্কোকে ‘নৃশংসতা’র অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন।
রাজনীতির খেলায় মানবতা হারাল
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ইউরোপীয় অংশীদারদের ‘স্বার্থপর’ আখ্যা দিয়েছেন। অথচ তার নিজের সরকারই সীমান্তে সেনা মোতায়েন করেছে। ইইউ অভ্যন্তরীণ মন্ত্রীদের জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। সবাই বলছে ‘শক্তিশালী সীমান্ত’ দরকার। কিন্তু কেউ বলছে না, কেন এই মানুষগুলো এত বড় ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র ও কাঁটাতার পেরোতে বাধ্য হচ্ছেন। দারিদ্র্য, যুদ্ধ, জলবায়ু সংকট—এসবের কথা উঠছে না। উঠছে শুধু ‘ফেরত পাঠানো’ ও ‘নিয়ন্ত্রণ’।
সেউতার শিক্ষা: মানবতাবাদ এখন শুধু স্লোগান
সেউতার এই ঘটনা প্রমাণ করে, ইউরোপের তথাকথিত মানবতাবাদ আসলে নির্বাচিত। যখন লাভ হয়, তখন মানবাধিকারের কথা বলা হয়। যখন সীমান্তে চাপ পড়ে, তখন মানবতা হত্যা করা হয়। হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছায় ফিরে গেছেন—এটা কোনো সফলতা নয়। এটা ব্যর্থতার স্বীকৃতি। যারা ফিরে যাননি, তাদের লাশ ইউরোপের নৈতিক দেউলিয়াত্বের সাক্ষী হয়ে থাকবে।
আজ সেউতা শুধু একটি স্পেনীয় অঞ্চল নয়। এটি ইউরোপের মানবতাবাদী মুখোশ খসে পড়ার প্রতীক। ৮৮টি প্রাণের বিনিময়ে ইউরোপ শিখল কী? আরও শক্তিশালী দেয়াল। আরও কঠোর ফেরত পাঠানো। আরও বেশি মৃত্যু। মানবতাবাদী ইউরোপ আজ মানবতা হত্যা করছে—এই সত্য অস্বীকার করার আর কোনো উপায় নেই।