জাতীয়

বিদেশে কর্মসংস্থানে BOESL-কে শক্তিশালী করার সময়

বিদেশে কর্মসংস্থানে BOESL-কে শক্তিশালী করার সময়

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থানের চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সীমিত চাকরির বাজারের বাস্তবতায় বিদেশে কর্মসংস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিপুলসংখ্যক দক্ষ, অর্ধদক্ষ ও অদক্ষ কর্মী বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই বিশাল জনশক্তিকে নিরাপদ, স্বচ্ছ ও কম খরচে বিদেশে পাঠাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) কার্যক্রম আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।

সরকারি হিসাবে, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত ১১ মাসে ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৮১৫ বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থান পেয়েছেন। আগামী অর্থবছরে প্রায় ১৪ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে সরকার। একই সঙ্গে নতুন শ্রমবাজার খোঁজা, বন্ধ বা সীমিত বাজার পুনরায় চালু করা এবং দক্ষ ও ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন কর্মী তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এই বিপুল শ্রমশক্তিকে বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে BOESL-এর ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ সরকারি মালিকানাধীন এবং মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই তুলনামূলক কম খরচে কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। BOESL-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকও জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ থাকে না এবং সরকার সরাসরি কর্মীদের অধিকার সুরক্ষার দায়িত্ব নেয়।

BOESL-এর নিজস্ব নিয়োগ প্ল্যাটফর্মেও বিদেশি নিয়োগের বিভিন্ন সুযোগ নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। বর্তমানে জর্ডান, ব্রুনাইসহ বিভিন্ন দেশের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে শ্রমিকদের সরাসরি আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধন, পছন্দের চাকরিতে আবেদন এবং আবেদনের অগ্রগতি জানার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

তবে দেশের মোট বিদেশগামী কর্মীর তুলনায় BOESL-এর মাধ্যমে পাঠানো কর্মীর সংখ্যা এখনো অনেক কম। BOESL-এর প্রকাশিত তথ্য ও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি মূলত দক্ষ ও অর্ধদক্ষ কর্মী পাঠানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ২০২৪ অর্থবছরে BOESL-এর মাধ্যমে ১৫ হাজার ৫৫৮ জন কর্মী বিদেশে গিয়েছিলেন। একই সময়ে বেসরকারি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক কর্মী বিদেশে পাঠানো হয়েছে।

এই ব্যবধানই একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে—রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত স্বচ্ছ ও তুলনামূলক কম ব্যয়ের নিয়োগব্যবস্থা কেন দেশের মোট বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বড় অংশকে এখনো ধারণ করতে পারছে না? BOESL-এর সক্ষমতা, জনবল, বিদেশি নিয়োগদাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং দ্রুত নিয়োগ সম্পন্ন করার প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানো গেলে এই ব্যবধান অনেকটাই কমানো সম্ভব।

বিশেষ করে দক্ষ শ্রমিকদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে বড় সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জর্ডান, মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন বাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা রয়েছে। সরকারের সাম্প্রতিক কর্মসূচিতে কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী দক্ষ করে ইউরোপের বাজারে পাঠানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ইতালির বাজারের জন্য ৬৯৮ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীকে আন্তর্জাতিক মানে যোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

শুধু দক্ষ কর্মী নয়, বিপুলসংখ্যক অদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ বাংলাদেশিও বিদেশে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। তাঁদের জন্য স্বল্পমেয়াদি ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণ বাড়ানো গেলে অদক্ষ শ্রমিককে দক্ষ বা অর্ধদক্ষ কর্মীতে রূপান্তর করে তুলনামূলক ভালো বেতন ও নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিদেশি শ্রমবাজারের নির্দিষ্ট চাহিদার সঙ্গে প্রশিক্ষণকে যুক্ত করা প্রয়োজন।

বিদেশে কর্মসংস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য শুধু বেকারত্ব কমানোর পথ নয়; এটি রেমিট্যান্সের অন্যতম প্রধান উৎস। একজন কর্মী বিদেশে গিয়ে আয় করলে তাঁর পরিবার সরাসরি উপকৃত হয়, আবার দেশে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ বাড়ে। ফলে দক্ষতার সঙ্গে বিদেশে কর্মী পাঠানো গেলে একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য হ্রাস, পারিবারিক আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

কিন্তু এই সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো মধ্যস্বত্বভোগী ও অনিয়ম। বিদেশে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ভুয়া চাকরির প্রলোভন, পাসপোর্ট আটকে রাখা, মিথ্যা ভিসা, অনুমোদনহীন শ্রমবাজারের নামে টাকা নেওয়া এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী চক্রের নিয়ন্ত্রণ—এসব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের অতীত অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বড় সতর্কবার্তা। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সরকার মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে। সরকারি সিদ্ধান্তে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণ ও অনিয়মের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কথিত সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং অনিয়ম নিয়ে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর একটি অংশও প্রকাশ্যে অভিযোগ তুলেছে। এ নিয়ে স্বচ্ছ ও সিন্ডিকেটমুক্ত নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খোলার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত তাই বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে সরকার জানায়, আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে সব খাতে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া শুরু করার বিষয়ে মালয়েশিয়ার সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে BOESL-কে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে প্রস্তাবিত ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা যাচাই করে মালয়েশিয়া চূড়ান্তভাবে কোন কোন প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগের সুযোগ দেবে, সেটিও নির্ধারণ করবে।

এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময় অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, নতুন প্রক্রিয়ায় নিয়োগের স্বচ্ছতা, অভিবাসন ব্যয় কমানো, কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দালাল ও প্রতারণামূলক সিন্ডিকেট ঠেকানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় কর্মীদের হয়রানি বন্ধ এবং পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।

বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে শুধু দেশের অভ্যন্তরের রিক্রুটিং এজেন্সি নয়, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস ও মিশনের ভূমিকা নিয়েও স্বচ্ছতা জরুরি। নিয়োগদাতার অস্তিত্ব, চাকরির চুক্তি, বেতন, কর্মস্থল, ভিসার ধরন ও কর্মীর নিরাপত্তা যাচাইয়ে দূতাবাসের কার্যকর ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। কারণ বিদেশে যাওয়ার পর প্রতারণা ধরা পড়লে একজন শ্রমিকের পক্ষে নিজের অধিকার রক্ষা করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।

সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় বিদেশে কর্মী পাঠানোর আগে যাচাইপ্রক্রিয়ার দুর্বলতাও সামনে এসেছে। কম্বোডিয়া, ব্রাজিল ও রাশিয়াগামী কিছু কর্মীর ক্ষেত্রে সরকারি ছাড়পত্র থাকা সত্ত্বেও প্রতারণা, পাচার বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পড়ার অভিযোগ তদন্তের আওতায় এসেছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৮ মাসে কম্বোডিয়ায় যাওয়ার জন্য ১৫ হাজার ৯২১ বাংলাদেশি সরকারি বহির্গমন ছাড়পত্র পেয়েছিলেন; তাঁদের মধ্যে অনেকে পরে সাইবার প্রতারণার চক্রে আটকে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাশিয়াগামী ৩০ বাংলাদেশির প্রতারণামূলক নিয়োগের অভিযোগেও সরকার তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উচ্চ বেতন ও নানা সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁদের বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। পরে তাঁদের নিরাপদে দেশে ফেরাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়।

এসব ঘটনা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—বিদেশে যাওয়ার আগে কাগজপত্র যাচাই করাই যথেষ্ট নয়; নিয়োগদাতা, কর্মস্থল এবং চাকরির বাস্তব অস্তিত্বও যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস বা মিশনের মাধ্যমে অফার লেটার, ভিসা ও নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

BOESL-এর মাধ্যমে নিয়োগ বাড়ানোর পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি এখানেই। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগ বাড়াতে পারলে দালালনির্ভরতা কমানো সম্ভব। একজন শ্রমিক কোথায় যাচ্ছেন, কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ করবেন, কত বেতন পাবেন, কত টাকা খরচ হবে এবং কী ধরনের চুক্তিতে যাচ্ছেন—এসব তথ্য আগেই প্রকাশ করা গেলে প্রতারণার সুযোগ কমে।

তবে BOESL-কেও শুধু নিয়োগের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। বিদেশি নিয়োগদাতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো, নতুন বাজার অনুসন্ধান, দ্রুত প্রার্থী বাছাই, ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সমন্বয় এবং ডিজিটাল আবেদনব্যবস্থা আরও কার্যকর করা জরুরি। সরকারি প্ল্যাটফর্মে নিয়োগের তথ্য সহজে পাওয়া এবং আবেদনের প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করার সুযোগ থাকলে কর্মীদের আস্থা বাড়বে।

অভিযোগের বিষয়টি আলাদাভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। রিক্রুটিং সিন্ডিকেট, সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর যোগসাজশ, বিদেশে বাংলাদেশের কোনো মিশনের কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম কিংবা অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে প্রমাণ ছাড়াই অভিযুক্ত করা যেমন অনুচিত, তেমনি অভিযোগকে উপেক্ষা করাও পুরো অভিবাসন ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করতে পারে।

এ ক্ষেত্রে স্বাধীন অভিযোগ ব্যবস্থাও প্রয়োজন। একজন বিদেশগামী কর্মী যেন দালাল, রিক্রুটিং এজেন্সি, সরকারি কর্মকর্তা বা বিদেশি নিয়োগদাতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারেন এবং সেই অভিযোগের অগ্রগতি অনলাইনে জানতে পারেন—এমন ব্যবস্থা কার্যকর করা দরকার। অভিযোগ তদন্তের সময়সীমা নির্ধারণ এবং প্রমাণিত অপরাধে দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করা জরুরি। কর্মীর কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া যাবে, কোন খাতে নেওয়া হচ্ছে, কাকে দেওয়া হচ্ছে এবং তার বিপরীতে কী সেবা পাওয়া যাচ্ছে—এসব তথ্য লিখিত ও ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা গেলে অবৈধ অর্থ আদায়ের সুযোগ কমবে। নগদ লেনদেনের পরিবর্তে ব্যাংক বা অনুমোদিত ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন।

সরকার ইতোমধ্যে কিছু ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নজির দেখিয়েছে। মালয়েশিয়া-সংশ্লিষ্ট অভিযোগে ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল এবং রাশিয়ায় প্রতারণামূলক নিয়োগের অভিযোগে তিনটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল তার উদাহরণ। তবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা যেন শুধু কয়েকটি ঘটনায় সীমাবদ্ধ না থাকে; পুরো ব্যবস্থায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

একই সঙ্গে বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণকে বাধ্যতামূলক ও বাজারভিত্তিক করার বিষয়টিও জরুরি। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ঘোষিত লক্ষ্যই হলো বিশ্ব শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ অভিবাসন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাড়ানো।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বাজারে ভাষা ও দক্ষতার গুরুত্ব বেশি। ইউরোপের বাজারেও নির্দিষ্ট পেশাগত মান পূরণ করতে হয়। ফলে বাংলাদেশ যদি শুধু সংখ্যার দিকে তাকিয়ে অদক্ষ শ্রমিক পাঠায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে কম মজুরি ও অনিরাপদ কর্মসংস্থানের চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন হবে। বরং অদক্ষ শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে পাঠানো এবং দক্ষ শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা বাড়ানো প্রয়োজন।

বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর অর্থনৈতিক সুফল সর্বাধিক করতে হলে শ্রমিকের আয় বাড়ানো এবং অভিবাসন ব্যয় কমানো—দুই দিকেই নজর দিতে হবে। একজন শ্রমিক বিদেশ যেতে যদি অতিরিক্ত ঋণ করতে বাধ্য হন, তবে তাঁর উপার্জনের বড় অংশ দীর্ঘ সময় ঋণ পরিশোধে চলে যায়। বিপরীতে কম খরচে বৈধভাবে বিদেশ যেতে পারলে পরিবারের হাতে বেশি অর্থ থাকে এবং রেমিট্যান্সের প্রকৃত সুফল বাড়ে।

এই জায়গায় BOESL-এর সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। প্রতিষ্ঠানটির মূল দর্শনই হলো নিরাপদ, নৈতিক ও সাশ্রয়ী অভিবাসন। এর নিয়োগব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ না রেখে সরাসরি আবেদন এবং সরকারি তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা রয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তাই BOESL-কে কেবল একটি সরকারি নিয়োগকারী সংস্থা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান কৌশলের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যেতে পারে। বিদেশি সরকার ও নিয়োগদাতার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিবছর আরও বড়সংখ্যক কর্মী পাঠানোর সক্ষমতা তৈরি করা প্রয়োজন।

দেশে কর্মসংস্থানের চাপ যত বাড়বে, বিদেশে কর্মসংস্থানের গুরুত্বও তত বাড়বে। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার সুযোগ যেন নতুন ধরনের শোষণ, ঋণের বোঝা কিংবা প্রতারণার কারণ না হয়—সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের নিরাপত্তা, মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিশ্চিত করাই হতে হবে রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য।

সার্বিকভাবে, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বৈদেশিক কর্মসংস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। হাজার হাজার দক্ষ শ্রমিকের পাশাপাশি লাখ লাখ অদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ কর্মী বিদেশে যাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাঁদের সঠিক প্রশিক্ষণ দিয়ে বৈধ, স্বচ্ছ ও কম খরচের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো গেলে বেকারত্ব কমানোর পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহও বাড়ানো সম্ভব।

তবে এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে সিন্ডিকেট, দালালচক্র, অবৈধ অর্থ লেনদেন এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যেকোনো ধরনের প্রভাব ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা, রিক্রুটিং এজেন্সি কিংবা বিদেশে বাংলাদেশের কোনো মিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ উঠলে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্‌ঘাটন এবং প্রমাণিত অপরাধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে—মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগ তার সর্বশেষ উদাহরণ। প্রাথমিক পর্যায়ে BOESL-কে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ। এখন প্রয়োজন এই সুযোগকে স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া।

কারণ একজন শ্রমিকের বিদেশযাত্রা শুধু একটি পরিবারের ভাগ্য বদলায় না; তাঁর পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখে। তাই শ্রমিক রপ্তানিকে শুধু জনশক্তি রপ্তানি হিসেবে নয়, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, রেমিট্যান্স ও অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল হিসেবে দেখতে হবে। BOESL-কে শক্তিশালী করে, সিন্ডিকেটমুক্ত নিয়োগ নিশ্চিত করে এবং বিদেশে কর্মীদের অধিকার সুরক্ষিত করতে পারলেই বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।