নিজস্ব প্রতিবেদক
উচ্চশিক্ষায় গবেষণার মান, অর্থায়নের স্বচ্ছতা এবং গবেষণা প্রস্তাব বাছাইয়ের প্রক্রিয়াকে আরও নিরপেক্ষ ও কার্যকর করতে বড় ধরনের সংস্কারের পথে এগোচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়নে স্বচ্ছতা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা এবং প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতিতে যোগ্য প্রস্তাব নির্বাচনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে গবেষণা অর্থায়নের প্রক্রিয়াকে সহজ, স্বচ্ছ ও গবেষকবান্ধব করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ বাড়লেও সেই অর্থ কীভাবে সবচেয়ে কার্যকর গবেষণায় পৌঁছাবে, সেটিই এখন ইউজিসির সামনে বড় প্রশ্ন। ২০২৬–২৭ অর্থবছরে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার জন্য ২২৬ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানিয়েছে ইউজিসি, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন প্রক্রিয়ায় অর্থায়ন সহজ ও স্বচ্ছ করার পাশাপাশি একই ধরনের গবেষণায় অর্থের পুনরাবৃত্তি এড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের জায়গা হলো স্বচ্ছতা। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল হায়ার এডুকেশন অ্যাক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন বা HEAT প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের পর্যালোচনা সভায় ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়নে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। তিনি Academic Transformation Fund বা ATF-এর আওতায় গবেষণা প্রস্তাব অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন এবং নির্ধারিত সময়সীমা মেনে প্রক্রিয়া শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেন।
এই উদ্যোগের গুরুত্ব এখানেই যে, গবেষণার জন্য বরাদ্দ অর্থ সীমিত; কিন্তু গবেষণা প্রস্তাবের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে কে অর্থ পাবেন, কোন গবেষণা জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কোন প্রকল্প বাস্তবসম্মত এবং কোন প্রস্তাবের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি হবে—এসব নির্ধারণে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া যত বেশি নিরপেক্ষ হবে, গবেষণা অর্থায়নের ফল তত বেশি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
একটি ভালো গবেষণা প্রস্তাব শুধু সুন্দর ভাষায় লেখা একটি পরিকল্পনা নয়। সেখানে গবেষণার সমস্যা, উদ্দেশ্য, পদ্ধতি, সম্ভাব্য ফলাফল, সময়সীমা, বাজেট এবং গবেষণার বাস্তব প্রয়োগ স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এসব মানদণ্ডের পাশাপাশি মূল্যায়নকারীর ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি কিংবা গবেষকের ব্যক্তিগত প্রভাব যেন সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
এ কারণে গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়নে অজ্ঞাতনামা বা anonymous evaluation পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ইউজিসির ICSETEP প্রকল্পের Research and Development Grant-এ প্রস্তাবের মূল অংশকে পরিচয় গোপন রেখে আলাদাভাবে উপস্থাপনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা যায়। প্রস্তাবের মূল গবেষণা অংশ এবং আবেদনকারী-সংক্রান্ত তথ্য পৃথক করার এই পদ্ধতি মূল্যায়নে ব্যক্তিগত পরিচয়ের প্রভাব কমানোর একটি কার্যকর ব্যবস্থা হতে পারে।
তবে শুধু পরিচয় গোপন করলেই মূল্যায়ন নিরপেক্ষ হয়ে যায় না। মূল্যায়নকারীদের নির্বাচন, স্বার্থের সংঘাত বা conflict of interest ব্যবস্থাপনা, নম্বর প্রদানের মানদণ্ড, মূল্যায়নের কারণ এবং পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ—সবকিছু একটি সুস্পষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
কোনো গবেষকের প্রস্তাব মূল্যায়নকারী যদি একই বিষয়ে সরাসরি প্রতিযোগী হন কিংবা প্রস্তাবিত গবেষণার সঙ্গে ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে যুক্ত থাকেন, তাহলে তাঁর মূল্যায়ন কতটা নিরপেক্ষ হবে—এ প্রশ্নের উত্তরও নীতিমালায় থাকা প্রয়োজন। ফলে গবেষণা মূল্যায়নে শুধু বিশেষজ্ঞ হওয়া যথেষ্ট নয়; মূল্যায়নকারীর স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতাও নিশ্চিত করতে হবে।
গবেষণা অর্থায়নে স্বচ্ছতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সিদ্ধান্তের কারণ জানানো। কোনো গবেষণা প্রস্তাব অনুমোদিত হলে কেন অনুমোদিত হয়েছে এবং কোনো প্রস্তাব বাতিল হলে কেন বাতিল হয়েছে—তার সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন প্রতিবেদন গবেষকের কাছে থাকলে গবেষণার মান উন্নত হবে। এতে একজন গবেষক পরবর্তী প্রস্তাবে নিজের দুর্বলতা সংশোধনের সুযোগ পাবেন।
একই সঙ্গে ইউজিসির উচিত গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়নের জন্য অভিন্ন ও প্রকাশ্য মানদণ্ড তৈরি করা। মৌলিকত্ব, গবেষণা প্রশ্নের গুরুত্ব, পদ্ধতির যথার্থতা, তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা, সম্ভাব্য ফলাফল, জাতীয় প্রয়োজন, আন্তর্জাতিক প্রাসঙ্গিকতা, বাজেটের যৌক্তিকতা এবং গবেষকের সক্ষমতা—এসব বিষয়কে নির্দিষ্ট নম্বরের কাঠামোয় আনলে মূল্যায়ন আরও তুলনাযোগ্য হতে পারে।
ইউজিসির বর্তমান উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গবেষণাকে জাতীয় প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করা। কমিশন জানিয়েছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা পরিকল্পনা, খাতভিত্তিক অর্থের প্রয়োজন এবং বাজেটের প্রাক্কলন জমা দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি শিক্ষার্থীদের গবেষণায় অংশগ্রহণ এবং জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের পাশাপাশি নবীন গবেষকদের যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এটি বাংলাদেশের গবেষণা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত। কারণ দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব একাডেমিক চাহিদা ও ব্যক্তিগত আগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার অভিযোগ রয়েছে। গবেষণা যদি কৃষি, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, নগর ব্যবস্থাপনা, শিল্প, জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের মতো জাতীয় সমস্যার সমাধানে ব্যবহার করা যায়, তাহলে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য বহুগুণ বাড়বে।
তবে জাতীয় প্রয়োজনের সঙ্গে গবেষণাকে যুক্ত করার অর্থ মৌলিক গবেষণাকে বাদ দেওয়া নয়। আজকের মৌলিক গবেষণাই আগামী দিনের প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ভিত্তি হতে পারে। তাই গবেষণা অর্থায়নে তাৎক্ষণিক প্রয়োগযোগ্য প্রকল্পের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি মৌলিক গবেষণার জন্যও আলাদা সুযোগ রাখতে হবে।
গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প খাতের সম্পর্কও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে। ইউজিসির ICSETEP প্রকল্পের Research and Development Grant-এ একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি সহযোগিতা, আন্তঃবিষয়ক গবেষণা, আধুনিক CSE/IT গবেষণা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রযুক্তিভিত্তিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের অর্থায়ন ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে।
এর মাধ্যমে বোঝা যায়, গবেষণাকে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের চার দেয়ালের মধ্যে না রেখে শিল্প ও সমাজের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি প্রযুক্তি যদি শিল্পে ব্যবহৃত হয়, কৃষকের উৎপাদন বাড়ায়, সরকারি সেবা সহজ করে কিংবা স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমায়, তখন গবেষণার প্রকৃত মূল্য দৃশ্যমান হয়।
গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়নে বড় সংস্কারের আরেকটি প্রয়োজনীয় দিক হতে পারে ডিজিটাল ব্যবস্থা। আবেদন থেকে শুরু করে মূল্যায়ন, নম্বর প্রদান, মন্তব্য, অনুমোদন, অর্থ ছাড় এবং অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ—পুরো প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা গেলে নথি হারানো, অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব এবং ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের সুযোগ কমতে পারে।
ইউজিসি এরই মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে একটি কেন্দ্রীয় গবেষণা রিপোজিটরি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। সেখানে গবেষণার তথ্য ও ফলাফল সংরক্ষণ, সমন্বয় ও ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এমন ব্যবস্থা কার্যকর হলে একই বিষয়ে একাধিক প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের গবেষণা হচ্ছে কি না, আগের গবেষণার ফল কোথায় পাওয়া যাবে এবং নতুন গবেষণায় কোন জ্ঞান ব্যবহার করা সম্ভব—এসব জানা সহজ হবে।
বাংলাদেশের গবেষণা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা হলো একই ধরনের গবেষণা বারবার হওয়া, গবেষণার ফল প্রকাশের পর বাস্তব প্রয়োগ না হওয়া এবং গবেষণার তথ্য এক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা। কেন্দ্রীয় রিপোজিটরি এই সমস্যার একটি অংশ সমাধান করতে পারে। তবে শুধু তথ্য জমা রাখলেই হবে না; গবেষক, নীতিনির্ধারক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য সেই তথ্য সহজে অনুসন্ধানযোগ্য ও ব্যবহারযোগ্য করতে হবে।
গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়নে সময়সীমাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি গবেষক যখন প্রস্তাব জমা দিয়ে দীর্ঘদিন সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকেন, তখন গবেষণার বিষয়টি পুরোনো হয়ে যেতে পারে, মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে কিংবা গবেষকের অন্য অর্থায়নের সুযোগ নষ্ট হতে পারে। তাই ইউজিসি চেয়ারম্যানের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মূল্যায়ন শেষ করার নির্দেশনাটি বাস্তবায়ন করা জরুরি।
একই সঙ্গে গবেষণা অনুদানের অর্থ ছাড়ে দীর্ঘসূত্রতা থাকলেও গবেষণা বাধাগ্রস্ত হয়। গবেষণার অর্থ অনুমোদিত হলেও যদি সময়মতো অর্থ না আসে, তাহলে মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ, গবেষণা সহকারী নিয়োগ, যন্ত্রপাতি কেনা কিংবা পরীক্ষাগারভিত্তিক কাজ বিলম্বিত হতে পারে। ফলে মূল্যায়ন সংস্কারের সঙ্গে অর্থ ছাড়ের প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও সংস্কার করতে হবে।
ইউজিসির সামনে এখন আরও বড় একটি প্রেক্ষাপট রয়েছে। কমিশন ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত উচ্চশিক্ষা রূপান্তরের জন্য পাঁচ বছরের একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করছে। পরিকল্পনায় স্নাতকদের কর্মসংস্থানযোগ্যতা বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সংযোগ, ডিজিটাল রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণের মতো বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এই বৃহত্তর সংস্কার পরিকল্পনায় গবেষণাকে কেন্দ্রীয় জায়গায় রাখতে হবে। কারণ মানসম্মত উচ্চশিক্ষা গবেষণা ছাড়া টেকসই হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যদি নতুন জ্ঞান তৈরি না করেন, শিক্ষার্থীরা যদি গবেষণায় যুক্ত না হন এবং গবেষণার ফল যদি সমাজে প্রয়োগ না হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি দেওয়ার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
তবে সংস্কারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সতর্কতা হলো—গবেষণাকে শুধু ‘অর্থ বরাদ্দের প্রকল্প’ বানানো যাবে না। কত টাকা খরচ হলো বা কতটি প্রকল্প অনুমোদিত হলো—এসব প্রশাসনিক সূচকের বাইরে গবেষণার গুণগত ফলাফলও মূল্যায়ন করতে হবে। কতটি মানসম্মত গবেষণা প্রকাশিত হলো, কতটি গবেষণার ফল নীতিনির্ধারণে ব্যবহৃত হলো, কতটি প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে প্রয়োগ হলো কিংবা কতটি সামাজিক সমস্যার সমাধানে গবেষণার ফল কাজে লাগল—এসব হতে পারে কার্যকর সূচক।
গবেষকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। গবেষণা প্রস্তাবে অতিরঞ্জিত ফলাফল দেখানো, অযৌক্তিক বাজেট তৈরি করা কিংবা শুধু অনুদান পাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রকল্প তৈরি করলে সংস্কারের সুফল পাওয়া যাবে না। গবেষণার নৈতিকতা, তথ্যের সততা, প্লেজিয়ারিজম প্রতিরোধ এবং ফলাফল প্রকাশের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা প্রশাসনকেও শক্তিশালী করা দরকার। গবেষককে শুধু গবেষণা প্রস্তাব লিখতে বললে হবে না; তথ্য সংগ্রহ, নৈতিক অনুমোদন, গবেষণা ব্যবস্থাপনা, পরিসংখ্যান, পেটেন্ট, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিতে হবে।
বিশেষ করে তরুণ গবেষকদের জন্য আলাদা সুযোগ তৈরি করা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন যোগ দেওয়া শিক্ষক বা গবেষক অনেক সময় অভিজ্ঞতার অভাবে বড় প্রকল্পের অর্থায়নে পিছিয়ে থাকেন। তাঁদের জন্য ছোট গবেষণা অনুদান, পরামর্শদাতা ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষণ চালু করা গেলে গবেষণায় নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবে।
নারী গবেষক, প্রত্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং অপেক্ষাকৃত কম সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের ক্ষেত্রেও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা দরকার। গবেষণার অর্থ যদি কেবল কয়েকটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঘুরপাক খায়, তাহলে দেশের সামগ্রিক জ্ঞানভিত্তিক সক্ষমতা বাড়বে না।
সবশেষে বলা যায়, ইউজিসির গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়নে সংস্কারের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘কার প্রস্তাব অনুমোদিত হলো’—এই প্রশ্নের পরিবর্তে ‘কেন প্রস্তাবটি যোগ্য বলে বিবেচিত হলো’—এই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত করা। গবেষণা অর্থায়ন কোনো ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়; এটি রাষ্ট্র ও জনগণের অর্থের বিনিয়োগ।
এই বিনিয়োগের প্রতিটি টাকা থেকে জ্ঞান, উদ্ভাবন ও জনকল্যাণের ফল পাওয়া দরকার। এজন্য মূল্যায়ন হতে হবে নিরপেক্ষ, মানদণ্ড হতে হবে স্পষ্ট, প্রক্রিয়া হতে হবে সময়বদ্ধ, অর্থায়ন হতে হবে স্বচ্ছ এবং গবেষণার ফলাফল হতে হবে যাচাইযোগ্য।
ইউজিসি যদি প্রস্তাব মূল্যায়নে স্বচ্ছতা, অজ্ঞাতনামা পর্যালোচনা, স্বার্থের সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল ট্র্যাকিং, দ্রুত অর্থ ছাড় এবং গবেষণার ফলাফল পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা কার্যকর করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে।
গবেষণা প্রস্তাবের মূল্যায়ন তাই কেবল প্রশাসনিক সংস্কার নয়; এটি দেশের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের ভিত্তি। ভালো গবেষককে ভালো প্রস্তাবের জন্য ন্যায্য সুযোগ দেওয়া এবং জনগণের অর্থে পরিচালিত গবেষণার ফল জনগণের কাজে ফিরিয়ে দেওয়াই হওয়া উচিত এই সংস্কারের চূড়ান্ত লক্ষ্য।