নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঢাকার মতো নগর এলাকা থেকে প্রত্যন্ত চর ও পাহাড়ি জনপদ—দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকসংকটে ভুগছে। বিশেষ করে প্রধান শিক্ষক পদে বিপুল শূন্যতা এবং সহকারী শিক্ষক পদে নতুন নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা প্রাথমিক শিক্ষার স্বাভাবিক কার্যক্রমকে চাপের মুখে ফেলেছে। সর্বশেষ সরকারি তথ্য বলছে, শুধু প্রধান শিক্ষক পদেই ৩৬ হাজার ২৩৫টি শূন্যপদ পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; এসব পদে পদোন্নতির পর খালি হওয়া সহকারী শিক্ষক পদও দ্রুত পূরণের পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষক সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে শ্রেণিকক্ষে। একজন শিক্ষককে একই সঙ্গে একাধিক শ্রেণির পাঠদান, প্রশাসনিক দায়িত্ব, পরীক্ষার কাজ, উপবৃত্তি ও বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচির দায়িত্ব পালন করতে হলে পাঠদানের জন্য নির্ধারিত সময় ও মনোযোগ কমে যায়। প্রাথমিক স্তরে এই সংকট আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শিক্ষাজীবনের শুরুতেই শিশুদের ভাষা, গণিত, বিজ্ঞান, সামাজিক আচরণ ও শেখার ভিত্তি তৈরি হয়। এই পর্যায়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকলে পরবর্তী শিক্ষাজীবনে তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৬ হাজার ২৩৫টি শূন্য প্রধান শিক্ষক পদ পূরণে সরকার দ্রুত পদোন্নতির উদ্যোগ নিয়েছে। দীর্ঘ প্রায় নয় বছরের আইনি জটিলতার অবসানের পর এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন। একই সঙ্গে এসব পদে পদোন্নতির ফলে যে ৩৮ হাজার ৪৪৩টি সহকারী শিক্ষক পদ খালি হবে, সেগুলোও দ্রুত নিয়োগের মাধ্যমে পূরণের কথা বলা হয়েছে।
এর আগে জুলাই মাসে সংসদে মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, নতুন নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক পদের ৮০ শতাংশ পদ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হবে। দীর্ঘদিন আদালতে মামলা চলার কারণে এই পদোন্নতি আটকে ছিল। আদালতের জটিলতা কাটায় এখন পদগুলো পূরণের পথ তৈরি হয়েছে।
এখানে সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—প্রধান শিক্ষক পদ খালি থাকা শুধু একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার অনুপস্থিতি নয়। একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাধারণত পাঠদান তদারকি, শিক্ষক সমন্বয়, বিদ্যালয়ের প্রশাসন, অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার দায়িত্ব পালন করেন। ফলে দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক না থাকলে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি অন্য শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপ তৈরি হতে পারে।
আবার প্রধান শিক্ষক পদে কর্মরত সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতি দেওয়া হলে নতুন করে সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য হবে। ফলে শুধু পদোন্নতি দিয়ে সংকটের সমাধান হবে না। সরকার যে ৩৮ হাজার ৪৪৩টি সহকারী শিক্ষক পদ পূরণের কথা জানিয়েছে, সেই নিয়োগ দ্রুত, স্বচ্ছ ও যোগ্যতাভিত্তিকভাবে সম্পন্ন করাই হবে পরবর্তী বড় পরীক্ষা।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু মোট শূন্যপদের হিসাব যথেষ্ট নয়। কোন জেলায় কতটি পদ খালি, কোন বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষক সবচেয়ে কম, কোন অঞ্চলে শিক্ষক ধরে রাখা কঠিন এবং কোথায় একাধিক শ্রেণি একসঙ্গে পড়াতে হচ্ছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষক বণ্টন করা প্রয়োজন। শহরের কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষক তুলনামূলক বেশি থাকলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি বিদ্যালয়ে যদি প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকে, তাহলে জাতীয় পর্যায়ের মোট সংখ্যার হিসাব শিক্ষার্থীর বাস্তব সংকট প্রকাশ করবে না।
দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় ভৌগোলিক বৈষম্যও বড় সমস্যা। সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশের ২ হাজার ৮৩৯টি গ্রামে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। এসব গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়গামী বয়সী শিশুর সংখ্যা ২ লাখ ৭৬ হাজার ৫১৬। অর্থাৎ শুধু বিদ্যমান বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ করলেই প্রাথমিক শিক্ষার সব সংকট দূর হবে না; যেসব এলাকায় বিদ্যালয়ই নেই, সেসব এলাকার শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
এখানে সরকারের সামনে দুটি সমান্তরাল কাজ রয়েছে। একদিকে বিদ্যমান বিদ্যালয়গুলোর শূন্য শিক্ষক পদ পূরণ করতে হবে, অন্যদিকে বিদ্যালয়বিহীন গ্রামগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন বিদ্যালয় স্থাপন বা কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একটি শিশুর বাড়ির কাছাকাছি বিদ্যালয় না থাকলে শিক্ষকসংখ্যা বাড়ালেও তার শিক্ষা নিশ্চিত হবে না।
শিক্ষক সংকটের সঙ্গে শিক্ষার মান সরাসরি সম্পর্কিত। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক কম থাকলে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত দুর্বলতা শনাক্ত করা, পিছিয়ে পড়া শিশুকে আলাদা সহায়তা দেওয়া এবং নিয়মিত মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে একজন শিক্ষকের পক্ষে বড়সংখ্যক শিক্ষার্থীকে একই মানের ব্যক্তিগত মনোযোগ দেওয়া বাস্তবে কঠিন।
তবে শিক্ষকসংখ্যা বাড়ালেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হবে—এমন ধারণাও ঠিক নয়। নিয়োগের পর প্রশিক্ষণ, বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি, পাঠদানের পদ্ধতি, শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা উপকরণ এবং শিক্ষক মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। একজন দক্ষ শিক্ষক সীমিত সম্পদেও ভালো শিক্ষা দিতে পারেন, কিন্তু একজন অপ্রশিক্ষিত বা অনিয়মিত শিক্ষক বেশি সংখ্যায় থাকলেও শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করা কঠিন।
এ কারণে নতুন নিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দিতে হবে। চলতি বছর প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে নির্বাচিত ১৪ হাজার ৩০০ প্রার্থীকে বাদ না দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি জানিয়েছিলেন, নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ হয়েছে এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে নিয়োগপত্র দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
শিক্ষক সংকটের আরেকটি দিক হলো শূন্যপদ পূরণের গতি। একটি পদ খালি হওয়ার পর নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগলে বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন শিক্ষকবিহীন থাকতে পারে। আবার নিয়োগের পর পদায়ন যদি প্রয়োজনীয় বিদ্যালয়ের বদলে তুলনামূলক সুবিধাজনক এলাকায় বেশি হয়, তাহলে সামগ্রিক সংকট থেকেই যায়। তাই নিয়োগ ও পদায়ন—দুটিকে একই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।
বিশেষ করে প্রত্যন্ত, চর, হাওর, পাহাড়ি ও উপকূলীয় এলাকায় শিক্ষক ধরে রাখার জন্য বাস্তবসম্মত নীতি প্রয়োজন। এসব অঞ্চলে যাতায়াত, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার সীমাবদ্ধতা থাকায় অনেক শিক্ষক দীর্ঘমেয়াদে থাকতে অনাগ্রহী হতে পারেন। ফলে শুধু নিয়োগ দিলেই হবে না; দুর্গম বিদ্যালয়ে শিক্ষক ধরে রাখার জন্য প্রণোদনা ও প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা কোনো খাতের সাধারণ সরকারি সেবা নয়; এটি রাষ্ট্রের মানবসম্পদ তৈরির ভিত্তি। একটি শিশু প্রথম বিদ্যালয়ে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা পায়, সেটিই তার শিক্ষা সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদি ধারণা তৈরি করে। শিক্ষক না থাকলে সেই শিশুর কাছে বিদ্যালয় হয়ে উঠতে পারে অনিয়মিত পাঠদান, অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার জায়গা। এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি পরিসংখ্যান দিয়ে সহজে পরিমাপ করা যায় না।
তাই শিক্ষক সংকটের সমাধানে শুধু ‘কত পদে নিয়োগ দেওয়া হলো’—এই প্রশ্নের বাইরে যেতে হবে। দেখতে হবে, প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী অনুপাতে পর্যাপ্ত শিক্ষক আছে কি না, শিক্ষক নিয়মিত উপস্থিত আছেন কি না, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক—দুই স্তরের নেতৃত্ব কার্যকর কি না এবং প্রত্যন্ত এলাকার শিশুরাও সমান মানের শিক্ষা পাচ্ছে কি না।
সরকারের বর্তমান উদ্যোগ সেই অর্থে একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। ৩৬ হাজার ২৩৫টি প্রধান শিক্ষক পদ পূরণ এবং পরবর্তী সময়ে ৩৮ হাজার ৪৪৩টি সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের একটি বড় শূন্যতা কমতে পারে।
কিন্তু এই উদ্যোগ সফল হবে তখনই, যখন নিয়োগপ্রক্রিয়া দ্রুততার পাশাপাশি স্বচ্ছ থাকবে, পদায়ন হবে প্রয়োজনের ভিত্তিতে এবং নিয়োগের পর শিক্ষকরা কার্যকর প্রশিক্ষণ ও পেশাগত সহায়তা পাবেন। একই সঙ্গে বিদ্যালয়বিহীন গ্রামের শিশুদের জন্য নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট কেবল একটি প্রশাসনিক শূন্যপদের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি শিশুর পড়তে শেখা, লিখতে শেখা, গণিত বোঝা, প্রশ্ন করতে শেখা এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার সুযোগ। একটি পদ খালি থাকা হয়তো সরকারি নথিতে একটি সংখ্যা; কিন্তু সেই পদে শিক্ষক না থাকলে তার প্রভাব পড়ে শত শত শিশুর শিক্ষাজীবনে।
তাই শিক্ষক নিয়োগকে শুধু চাকরি সৃষ্টি হিসেবে নয়, জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। আজকের একটি দক্ষ প্রাথমিক শিক্ষক আগামী দিনের হাজারো শিক্ষার্থীর ভিত গড়ে দিতে পারেন। আর সেই কারণেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট যত দ্রুত সম্ভব কমিয়ে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিশ্চিত করা এখন শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।