লাইফ স্টাইল

সংসারের অদৃশ্য শ্রম: বাংলাদেশের নারীরা পাচ্ছেন না তাদের প্রাপ্য মূল্য

সংসারের অদৃশ্য শ্রম: বাংলাদেশের নারীরা পাচ্ছেন না তাদের প্রাপ্য মূল্য

সংসারের অদৃশ্য শ্রম: বাংলাদেশের নারীরা পাচ্ছেন না তাদের প্রাপ্য মূল্য

ঘরের কাজ কাজ নয়”—সমাজের প্রচলিত ধারণা

 

জি এম রফিক:

বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরের ভেতরে প্রতিদিন চলছে এক অদৃশ্য অর্থনীতি। ভোরে ঘুম থেকে ওঠা থেকে রাতের শেষ মানুষটি ঘুমিয়ে পড়া পর্যন্ত রান্না, কাপড় ধোয়া, সন্তানের দেখাশোনা, বয়স্কদের সেবা, ঘর গোছানোসবকিছু মিলিয়ে যে শ্রম নারীরা দিচ্ছেন, তার কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই, নেই ছুটি, নেই বেতনও। অথচ গবেষণা বলছে, এই শ্রমই পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখছে।

সম্প্রতি UN Women এবং Bangladesh Bureau of Statistics–এর যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে নারীদের অবৈতনিক গৃহস্থালি ও পরিচর্যা কাজ দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১৮.৯ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থনৈতিক মূল্য বহন করে। এই কাজের আর্থিক মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এর ৮৫ শতাংশ শ্রমই দিচ্ছেন নারীরা।

ঘরের কাজ কাজ নয়”—সমাজের প্রচলিত ধারণা

বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহরপ্রায় সর্বত্রই গৃহস্থালি কাজকে নারীর “দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়, শ্রম হিসেবে নয়। একজন নারী যদি অফিস করেন, তারপরও ঘরে ফিরে তাকে রান্না, সন্তান সামলানো, পরিবারের অন্য সদস্যদের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে তিনি একই সঙ্গে বেতনভুক্ত ও অবৈতনিকদুই ধরনের শ্রম দিচ্ছেন।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় সাত গুণ বেশি সময় ব্যয় করেন অবৈতনিক গৃহস্থালি ও পরিচর্যা কাজে।

নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, এই অদৃশ্য শ্রমকে দীর্ঘদিন ধরে “ভালোবাসা বা “পারিবারিক দায়িত্ব বলে স্বাভাবিক করে তোলা হয়েছে। ফলে নারীরা অর্থনৈতিক অবদান রাখলেও তারা সম্পদের মালিকানা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা সামাজিক স্বীকৃতিতে পিছিয়ে থাকছেন।

সংসারের শ্রমের কি অর্থমূল্য হওয়া উচিত?

এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। একদল অর্থনীতিবিদ মনে করেন, গৃহস্থালি শ্রমকে সরাসরি বেতনের আওতায় আনা বাস্তবসম্মত নয়; তবে রাষ্ট্রীয় নীতিতে এর স্বীকৃতি জরুরি। অন্যদিকে নারীবাদী সংগঠনগুলো বলছে, স্বীকৃতি ছাড়া সমতা সম্ভব নয়।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ)-এর বর্তমান নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেছেন, নারীদের অবৈতনিক শ্রমকে রাষ্ট্রীয় হিসাবের আওতায় আনা হলে সমাজে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আসবে এবং নীতিনির্ধারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

নারী সংগঠনগুলোর দাবি, অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ দরকার

গৃহস্থালি শ্রমকে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করা

পরিচর্যা অর্থনীতির জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ

পুরুষ ও নারীর মধ্যে গৃহস্থালি দায়িত্ব ভাগাভাগি নিশ্চিত করা

বাংলাদেশের নারীদের বাস্তবতা

রাজধানী ঢাকার কর্মজীবী নারী থেকে শুরু করে গ্রামের গৃহিণীসবার গল্প প্রায় একই। অনেক নারী জানান, তারা দিনে ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেন। কিন্তু সংসারের আয়-ব্যয়ের হিসাবের খাতায় তাদের নাম থাকে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোয় এখনও নারীর শ্রমকে “স্বাভাবিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। ফলে গৃহিণীদের আর্থিক নিরাপত্তা, পেনশন, সামাজিক সুরক্ষা কিংবা সম্পত্তিতে ন্যায্য অংশগ্রহণ প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এমনকি অনেক নারী পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণেও প্রভাব রাখতে পারেন না, যদিও সংসার চালানোর মূল দায়িত্ব তার কাঁধেই থাকে।

বিশ্বে কী হচ্ছে?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন “কেয়ার ইকোনমি বা পরিচর্যা অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতায় নারীদের পরিচর্যা শ্রম কমাতে বিশেষ “Care Block” চালু করা হয়েছে, যেখানে শিশু পরিচর্যা, প্রশিক্ষণ ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দেওয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপেও গৃহস্থালি শ্রমকে জাতীয় অর্থনীতির অংশ হিসেবে হিসাব করার আলোচনা বাড়ছে।

সামাজিক পরিবর্তন ছাড়া সমাধান অসম্ভব

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অর্থমূল্য নির্ধারণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। পরিবারে পুরুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো, কর্মজীবী নারীর জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা বৃদ্ধি এবং গৃহিণীদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, “ঘরের কাজকে যদি কাজ হিসেবেই স্বীকৃতি না দেওয়া হয়, তাহলে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন কখনোই পূর্ণতা পাবে না।

অদৃশ্য শ্রমের দৃশ্যমান স্বীকৃতি চাই

বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবার ও সামাজিক কাঠামোসবকিছুর ভিত্তিতে রয়েছে নারীদের এই অদৃশ্য শ্রম। অথচ দিনের পর দিন সেই শ্রম থেকে যাচ্ছে স্বীকৃতিহীন।

একজন গৃহিণী হয়তো মাস শেষে বেতন পান না, কিন্তু তার শ্রম থেমে গেলে থেমে যাবে একটি পরিবার, থমকে যাবে সমাজের চাকা। তাই প্রশ্ন উঠছেযে শ্রম ছাড়া সমাজ অচল, সেই শ্রমের কি সত্যিই কোনো অর্থমূল্য নেই?