দেশে বিচিত্র সব মাদক নীরবে ছড়িয়ে পড়েছে
অনলাইন ডেক্স:
দেশে বিচিত্র সব মাদক নীরবে ছড়িয়ে পড়েছে। সময়ের চাহিদায় ওসব মাদকেও এসেছে পরিবর্তন। আর নতুন প্রজন্মের মাদক অনেক বেশি ব্যয়বহুল। বিগত ২০১৮ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এক ডজনের বেশি নতুন প্রজন্মের মাদকের সন্ধান পেয়েছে। নতুন ওই মাদকের মধ্যে রয়েছে এমডিএমবি, আইস, খাথ, এলএসডি, ফেন্টানাইল, ব্ল্যাক কোকেন, এমডিএমএ, ডিএমটি, ডিওবি, ম্যাজিক মাশরুম, কুশ, ট্যাপেন্টাডল, ট্রামাডল এবং কিটামিন প্রভৃতি। বর্তমানে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে তরুণদের বড় একটি অংশের মধ্যে নতুন ওই মাদকের ব্যবহার বাড়ছে। যা জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য নতুন হুমকি সৃষ্টি করছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, অনেকটা নিভৃতেই নতুন প্রজন্মের মাদকগুলো দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তৈরি করে নিয়েছে বাজারও। নতুন প্রজন্মের ওই মাদকের অন্তত ৯০ শতাংশ বেচাকেনা ও টাকা পরিশোধ করা হয় অনলাইনে। যদিও ইতিমধ্যে সরকার ডিজিটাল (অনলাইন) মাধ্যমে পরিচালিত নতুন প্রজন্মের মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে মাদক আইন সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। মূলত দেশে নতুন প্রজন্মের মাদক ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসছে। মাদক কারবারিরা ওসব মাদক দেশে নিয়ে আসছে পার্সেলে কিংবা যাত্রীবেশে বহন করে। ইতিমধ্যে ওই ধরনের কয়েকজন কারবারিকে আটকও করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।
সূত্র জানায়, দেশে নতুন প্রজন্মের মাদকের পাশাপাশি থেমে নেই পুরনো মাদকের বিস্তারও। বরং ওসব মাদকের বিস্তার যে আতঙ্কজনকভাবে বাড়ছে তা ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন, কোকেন ও ফেনসিডিল জব্দের তালিকাই বলে দিচ্ছে। গত বছর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী গড়ে প্রতি মাসে ৩৬ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার হলেও চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে গড়ে ৪০ লাখের বেশি ইয়াবা জব্দ করেছে। তাছাড়া গত বছর ১৬৬ কেজি হেরোইন উদ্ধার হলেও চলতি বছর প্রথম তিন মাসে উদ্ধার করা হয়েছে ৬১ কেজি হেরোইন। তাছাড়া গত বছর ১৪ কেজি ৬০০ গ্রাম কোকেন উদ্ধার করা হলেও চলতি বছর প্রথম তিন মাসে উদ্ধার করা হয়েছে ১৬ কেজি কোকেন। তাতেই স্পষ্ট, দেশে বাড়ছে ইয়াবা, কোকেন, হেরোইন, গাঁজাসহ প্রচলিত মাদকের বিস্তার। আর যতো মাদক উদ্ধার হচ্ছে তার কয়েক গুণ বেশি আইনের ফাঁকফোকর এড়িয়ে চলে সেবনকারীদের কাছে যাচ্ছে। গত মার্চ মাসে মাদক বিরোধী এক অভিযানে উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাটের ভেতর অস্থায়ী একটি ল্যাবরেটরি পাওয়া যায়। যেখানে তরল কিটামিনকে পাউডারে পরিণত করে ব্লুটুথ স্পিকার ও সাউন্ড ইকুইপমেন্টের ভেতরে ঢুকিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছিল। সেখান থেকে ৬ কেজি কিটামিন, ডিজিটাল স্কেল, প্যাকেজিং মেশিন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনে ব্যবহৃত একটি পেনড্রাইভ উদ্ধার হয়। আর এভাবে রূপান্তর করেই নতুন প্রজন্মের মাদক পৌঁছে দেয়া হয় মাদকসেবীদের কাছে। তবে ধনিক শ্রেণির তরুণ প্রজন্ম নতুন প্রজন্মের মাদকের বড় ভোক্তা।
সূত্র আরো জানায়, মাদকপাচারকারী চক্রগুলো সীমান্তভিত্তিক কার্যক্রম ছাড়িয়ে এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্ম, ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন এবং ডার্ক ওয়েবের মতো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করছে। সেজন্য সরকার সমপ্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ (সংশোধন) ২০২৬-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে। তাতে অনলাইন মাধ্যমে মাদক কারবারের বিরুদ্ধে বিশেষ বিধান যুক্ত করা হয়েছে। কারণ বিদ্যমান আইনে ওই ধরনের অপরাধ মোকাবেলা করা কঠিন। তবে প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং কিংবা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা, সরবরাহ, পরিবহন বা বিতরণ করা ফৌজদারি অপরাধ। একই সঙ্গে মাদকপাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম, ই-ওয়ালেট, ভার্চুয়াল সম্পদ বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ লেনদেনও অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে। মাদকের বড় অংশ সীমান্ত পথ, কুরিয়ার সেবা অথবা বৈধ ওষুধের সরবরাহ চেইন এবং অনলাইনভিত্তিক চক্রের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করছে। সমপ্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নতুন প্রজন্মের মাদকের ‘মিনি ল্যাব’ বা ছোট কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। যেখানে কিটামিনসহ কিছু সিনথেটিক মাদক প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছিল। বিদেশি নাগরিকদের একটি চক্রের যোগসাজশে পরিচালিত হচ্ছিল ওসব কার্যক্রম। ফলে বিদেশ থেকে দেশের ভেতরে বর্তমানে কৃত্রিম মাদক প্রবেশের পাশাপাশি সহজে তৈরিও হচ্ছে। মাদক চক্রগুলো শুরুতে বাজারজাত করতে শুরু করে নতুন প্রজন্মের মাদক আইস, তারপর এলএসডি, ম্যাজিক মাশরুম এবং পরে এমডিএমবি।
এদিকে নতুন প্রজন্মের মাদকগুলো দ্রুত আসক্তি তৈরি করে। যা সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক। ওসব মাদক দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে ব্যবহারকারীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সহজ হয়েছে নতুন প্রজন্মের মাদকের বিস্তার। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী শুধু গ্রেপ্তারের সময় মামলাগুলো নথিবদ্ধ করছে। কিন্তু এনক্রিপ্টেড অ্যাপস এবং আন্তর্জাতিক পার্সেল সার্ভিসের মাধ্যমে যে সরবরাহ চেইন চলছে সেগুলো তদারকি করছে না। বর্তমানে অবৈধ মাদক ব্যবহারকারী তরুণদের মধ্যে হেরোইনের মতো প্রচলিত মাদকের চেয়ে নতুন প্রজন্মের সিনথেটিক (কৃত্রিম) মাদকের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশি। ওই মাদক দেশে প্রবেশের তিনটি প্রধান মাধ্যম চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো হলো আন্তর্জাতিক পার্সেল সার্ভিস (ইএমএস, সাধারণ কুরিয়ার), বৈধ ওষুধের সরবরাহ চেইন এবং আন্তঃসীমান্ত চোরাচালান চক্র।
এ প্রসঙ্গে ডিএনসির ঢাকা বিভাগের গোয়েন্দা শাখার উপ-পরিচালক মো. মেহেদী হাসান জানান, বিগত তিন-চার বছর ধরে বেশ কিছু নতুন মাদক ধরা হয়েছে। ওসব মাদকের প্রতি উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীদের আগ্রহ বেশি। সেগুলো তারা বাইরের দেশ থেকে ডার্কওয়েবে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের মাধ্যমে অর্ডার করে। তার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে অনলাইন ও বিভিন্ন অনলাইন অ্যাপস। ওই ধরনের কিছু মামলা তদন্ত করা হয়েছে। আর ডিএনসি নতুন প্রজন্মের মাদক নিয়ন্ত্রণে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
একই প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, মাদক কারবারি ও সেবীদের বিরুদ্ধে পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত রেখেছে। একই সঙ্গে নতুন মাদকের প্রতি কঠোর নজরদারি রেখে জড়িতদের আনা হচ্ছে আইনের আওতায়।
# এফএনএস এর সৌজন্যে