নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল
ড্রাইভিং লাইসেন্স করে দেওয়ার নামে অর্থ দাবির অভিযোগে বরিশাল বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে এক দালালকে হাতেনাতে আটক করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০২৫ সালের ৭ মে বরিশাল নগরীর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নিচতলায় অবস্থিত বিআরটিএ কার্যালয়ে পরিচালিত এ অভিযানে সঞ্জীব কুমার দাস নামে ওই ব্যক্তিকে আটক করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে এক মাসের কারাদণ্ড ও ২০০ টাকা জরিমানা করেন।
দুদক সূত্রে জানা যায়, বরিশাল বিআরটিএ কার্যালয়ে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অনিয়ম ও দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ পাওয়ার পর অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ছদ্মবেশী অভিযান পরিচালনা করা হয়। দুদকের কর্মকর্তারা সেবাগ্রহীতার পরিচয়ে দুটি পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স করার জন্য বিআরটিএ কার্যালয়ে যান। এ সময় সঞ্জীব কুমার দাস দুটি লাইসেন্স করে দেওয়ার বিনিময়ে ২১ হাজার টাকা দাবি করেন বলে দুদকের কর্মকর্তারা জানান। এরপর ঘটনাস্থলেই তাকে আটক করা হয়।
অভিযানটি পরিচালনা করেন দুদক বরিশাল সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রাজ কুমার সাহা। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রবিউল হাসান ভূঁইয়া অভিযানে যুক্ত হন। আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং আদালত তাকে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেন।
দুদকের কর্মকর্তারা জানান, শুধু দালালকে আটক করাই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল না। এই দালালচক্রের সঙ্গে বিআরটিএ কার্যালয়ের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। সংশ্লিষ্টতা বা ঘুষ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়।
বরিশাল বিআরটিএতে এ ধরনের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহনের নিবন্ধন ও অন্যান্য সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া। দুদকের অভিযানের সময় মোটরসাইকেলের নিবন্ধন করতে আসা সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকেও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগের কথা জানানো হয়েছিল। ফলে তদন্তের বিষয়টি শুধু একজন দালালের অর্থ দাবিতে সীমাবদ্ধ না রেখে সংশ্লিষ্ট সেবা প্রক্রিয়ায় কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসূত্র ছিল কি না, তা যাচাইয়ের প্রয়োজন দেখা দেয়।
ঘটনাটি একই সঙ্গে সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী নির্ভরতার একটি চিত্রও সামনে আনে। নির্ধারিত সরকারি ফি দিয়ে সরাসরি সেবা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও কোনো সেবাগ্রহীতা যদি দ্রুত কাজ করানো বা প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য দালালের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন, তাহলে সেখানে সেবা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। বিশেষ করে ড্রাইভিং লাইসেন্সের মতো নাগরিকদের নিয়মিত প্রয়োজনীয় সেবায় অতিরিক্ত অর্থের দাবি সেবাগ্রহীতাদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
তবে একজন দালালকে আটক বা তাঁর বিরুদ্ধে সাজা হওয়াকে পুরো বিআরটিএ কার্যালয়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগের সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, সেটি পৃথক তদন্তের বিষয়। দুদকও সে সময় এ বিষয়ে অনুসন্ধানের কথা জানিয়েছিল। ফলে প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অভিযোগ আরোপ না করে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করাই আইনসম্মত ও দায়িত্বশীল পদ্ধতি।
বরিশালের ঘটনাটি বিচ্ছিন্নও নয়। একই দিন দেশের বিআরটিএর ৩৫টি কার্যালয়ে ঘুষ ও দালালচক্রের বিরুদ্ধে একযোগে অভিযান পরিচালনা করে দুদক। এসব অভিযানের লক্ষ্য ছিল ড্রাইভিং লাইসেন্স ও যানবাহনের ফিটনেস সনদসহ বিভিন্ন সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ যাচাই করা।
দালালচক্র বন্ধে শুধু অভিযান পরিচালনা ও শাস্তি যথেষ্ট নয়। সেবাগ্রহীতারা যাতে সরাসরি নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন করতে পারেন, সরকারি ফি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পান এবং কোনো কর্মকর্তা বা মধ্যস্থতাকারী অতিরিক্ত অর্থ দাবি করলে নিরাপদে অভিযোগ জানাতে পারেন, সে ব্যবস্থা কার্যকর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সেবার প্রতিটি ধাপে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও নির্ধারিত সময়সীমা স্পষ্ট থাকলে মধ্যস্থতাকারীর সুযোগ কমতে পারে।
বরিশাল বিআরটিএর অভিযানে ২১ হাজার টাকা দাবির অভিযোগে দালাল আটকের ঘটনাটি তাই শুধু একটি তাৎক্ষণিক অভিযান নয়; সরকারি সেবা গ্রহণে দালালনির্ভরতার ঝুঁকিও সামনে এনেছে। এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো, ওই দালালের সঙ্গে কারও প্রাতিষ্ঠানিক যোগসূত্র ছিল কি না, এ ধরনের অর্থ দাবির পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ ব্যবস্থা কাজ করছে কি না এবং সাধারণ সেবাগ্রহীতারা কেন মধ্যস্থতাকারীর দ্বারস্থ হচ্ছেন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা।
দুদকের তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং একই সঙ্গে সেবা ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করার উদ্যোগ প্রয়োজন। আর অভিযোগের কোনো অংশ প্রমাণিত না হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো জরুরি। কারণ দুর্নীতি প্রতিরোধের পাশাপাশি নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করাও একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় সেবা ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ।