শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগরে দুর্বৃত্তের বুলেটে গুলিবিদ্ধ হওয়া আপসহীন বক্তা ওসমান হাদির ঘটনাটি স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে বারবার ফিরে আসা এক নির্মম অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি। ওসমান হাদি এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, কিন্তু তার ওপর চালানো এই হামলা কেবল একজন ব্যক্তিকে নয়, বরং জাতীয় চেতনাবোধ এবং সুনির্দিষ্ট একটি সময়ের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে আঘাত করেছে।
জাতীয় এই সংকটের মুহূর্তে রাজনৈতিক মতপার্থক্য, বিভেদ ও ধর্মীয় বিভাজন ছাপিয়ে মানুষ এক কাতারে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথের আলোচনা—সর্বত্র একটাই দাবি, ওসমান হাদির সুস্থতা এবং ঘাতকের কঠোরতম শাস্তি। বিজয়ের এই মাসে এমন সহিংসতা আবারও প্রমাণ করে, দমন-পীড়ন চালিয়ে বাঙালি জাতিকে স্তব্ধ করা যায় না।
বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের সুদীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ঘাতকের বুলেট কখনোই এই জাতিকে পরাজিত করতে পারেনি। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে ভাষা শহীদদের রক্ত, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আসাদের শার্টের রক্ত, যা আন্দোলনে দাবানল জ্বালিয়ে দিয়েছিল; কিংবা ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেনের বুকে লেখা স্লোগান—প্রতিটি ঘটনাই প্রমাণ করেছে, বুলেট কেবল শারীরিক আঘাত করতে পারে, কিন্তু এটি আন্দোলনের স্পিরিটকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে।
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে যে মেধাশূন্য করার চেষ্টা করেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, সেটিও ব্যর্থ হয়েছিল। দুই দিনের মধ্যেই হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। গত বছরের ১৬ জুলাই ছাত্রনেতা আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার পর যে গণআন্দোলন উত্তাল হয়েছিল এবং স্বৈরশাসককে উৎখাত করেছিল, সেখানেও এই সত্যেরই প্রতিষ্ঠা হয়েছিল—বুলেট জাতি ভাঙে না, বরং ঐক্যবদ্ধ করে।
ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি সেই দীর্ঘ বিপ্লবের ইতিহাসেরই একটি অংশ। এই মুহূর্তে সকলের প্রত্যাশা, শহীদ আসাদ, ডা. মিলন বা নূর হোসেনের মতো আত্মদান নয়, বরং বিশ্বজুড়ে মালালা ইউসুফজাই, হোসে রামোস-হোর্তা কিংবা গ্যাব্রিয়েল গিফোর্ডসের মতো বীরত্বময় প্রত্যাবর্তন হোক। এই আপসহীন তরুণ যেন সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন এবং আরও শক্তিশালী কণ্ঠে জাতিকে নেতৃত্ব দেন।