রাজনীতি

বাগেরহাট-৪ আওয়ামী লীগের সোম নাথ খোলস বদলে ধানের শীষে মনোনীত

বাগেরহাট-৪ আওয়ামী লীগের সোম নাথ খোলস বদলে ধানের শীষে মনোনীত

♦ হলফনামায় বিপুল সম্পদের ফিরিস্তি গোপন, তবুও বৈধ
♦ মামলা নিয়ে হলফনামায় ছলচাতুরি
♦ দেনদরবারে ছাত্র-জনতা হত্যা মামলা থেকে অব্যহতি!
♦ ক্ষুব্ধ স্থানীয় নেতাকর্মীরা


জি এম রফিক:
দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরইমধ্যে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ৩০০ আসনে যাচাই-বাছাই শেষে এক হাজার ৮৪২ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ  ঘোষণা করেছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। এরমধ্যে বাগেরহাট-৪ আসন থেকে ইসির তালিকায় এখন পর্যন্ত বৈধ পাঁচজন। যার মধ্যে আছেন বিএনপি থেকে মনোনিত প্রার্থী সোম নাথ দে। অথচ, বিভিন্ন নির্বাচনে তার দেওয়া হলফনামা বলছেন তিনি সেগুলোতে করেছেন তথ্য গোপন, দিয়েছেন ভুলও। আর এবারে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেওয়ার পর থেকেই এলাকায় শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা, ভোটারদের মধ্যে দেখা দিয়েছে সংশয়, এমনকি বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে অসন্তোষ, বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ। এর কারণ হিসেব মেলাতে অনুসন্ধানে নামে দৈনিক প্রভাতী খবর। তারপর থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে ভয়ঙ্কর সব তথ্য। 
জানা গেছে, এক সময় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান স্বৈরাচার হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের হাত ধরে সোম নাথ রাজনীতিতে নাম লেখালেও সময়ের পরিক্রমায় সুবিধা বুঝে একাধিকবার পাল্টেছেন খোলস। আওয়ামী লীগের আমলে দলে যোগ দিয়ে হন ফ্যাসিস্ট সরকার শেখ হাসিনার আস্থাভাজন। এলাকায় শুরু করেন লুটতরাজ আর দখলদারত্ব। আর এবার চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্র-জনতাকে হত্যা মামলার আসামি ও পরে দেনদরবারের মাধ্যমে চূড়ান্ত চার্জশিট থেকে নাম কাটিয়ে নেওয়া সোম নাথ সুযোগ বুঝে বিএনপিতে যোগ দিয়ে সেই দল থেকে বাগিয়ে নিয়েছেন নির্বাচনের টিকেট। 

হলফনামা যা বলছে
২০১৪ সালের রাতের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির হয়ে ভোটে অংশ নেওয়া সোম নাথের সম্পদ ও নগদ অর্থ দিনকে দিন বেড়ে হয়েছে আকাশচুম্বী। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী তার মোট সম্পদ ছিল এক কোটি ৫০ লাখ ৫ হাজার ১৮৫ টাকা, যা ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় ছিল ছয় লাখ ৯৬ হাজার ৬৬৭ টাকা। আর এবার তা গিয়ে পৌঁছেছে দুই কোটি ১৮ লাখ ৮২ হাজার ২৬ টাকায়। 

হলফনামায় গোপন ও ভুল তথ্য
বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রার্থী সোম নাথ দে তার হলফনামায় তথ্য গোপন করেছেন। শুধু তা-ই নয়, দিয়েছেন ভুল তথ্যও। এবারের হলফনামা বলছে, তার আছে টয়োটা এলিয়ন ও টয়োটা প্রিমিও মডেলের বিলাসবহুল দুটি গাড়ি, যেগুলোর নম্বর : ঢাকা মেট্রো-ঘ-৩২-৮০৫৪ ও ঢাকা মেট্রো-ঘ-৩৪-৮১৫০। অথচ বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথোরিটির (বিআরটিএ) ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বরের তথ্য বলছে, এই দুটি নম্বরের কোনো অস্তিত্বই নেই। 


আবার সোম নাথের ২০১৮ সালের হলফনামায় উল্লেখিত পূবালী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কেনা ঢাকা মেট্রো-গ-৩২-৮০৫৪ নম্বরের গাড়িটিও এখন অন্য ব্যক্তির নামে।
২০১৮ সালে হলফনামায় উল্লেখিত বাগেরহাটের মোড়লগঞ্জে এক তলা ভবনটি এখনও তার থাকলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে দাখিল করা হলফনামায় সেই বাড়ির উল্লেখ নেই। যদিও এবার অকৃষি জমি ও অজর্নকালীন আর্থিক মূল্যের তালিকায় দুই কোটি ১৯ লাখ ২০ হাজার ২০০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ, ২০১৮ সালের হলফ নামায় অকৃষি জমি পাঁচ দশমিক ৫০ শতক উল্লেখ করে মূল্য জানা নেই বলে দাখিল করা হয়।

বিপুল সম্পদের ফিরিস্তি গোপন
জানা গেছে, বাগেরহাট মোড়লগঞ্জের সেরেস্তদারবাড়ীর সি অ্যান্ড এফ ব্যবসায়ী সোম নাথ দে’র রয়েছে তিনতলা বিশিষ্ট বিলাসবহুল ভবন। অনুসন্ধান বলছে, এই বাড়ির জন্য মার্বেল টাইলস, ঝাড়বাতি আনা হয়েছে ইতালি থেকে, পাথর আনা হয়েছে ভারত থেকে। 


সিভিল ইঞ্জিনিয়ার রাকিবুল ইসলাম প্রভাতী খবরকে বলেন, ছবি দেখে আমার মনে হয়েছে, এরকম অত্যাধুনিক বিলাসবহুল আলিশান তিন তলা বাড়ি বানাতে পাঁচ কোটি টাকারও বেশি খরচ হয়। 


অনুসন্ধানে আরো জানাযায়  চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ বাদামতলী এলাকায় এইচএস শিপিং লাইনস ও মেসার্স সুন্দরবন এন্টারপ্রাইজ নামে দুটি প্রতিষ্ঠানে রয়েছে প্রায় শত কোটি টাকার বিনিয়োগ। 
রাজধানীর মতিঝিলে ১৫৩ নম্বর ‘রনি হাউজ’ ভবনে প্রতিষ্ঠান দুটির রয়েছে শাখা অফিস। মোড়লগঞ্জ উপজেলাসহ বাগেরহাটের বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে কয়েক’শ একর সম্পত্তি।
এছাড়া অভিযোগ আছে, সোম নাথ দে ইতালিতে থাকা তার দুই বোনকে ব্যবহার করে হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করেছেন শত কোটি টাকা।


হলফনামা বিশ্লেষণে আইনজীবীর বক্তব্য
হলফনামা আদ্যপান্ত নিয়ে প্রভাতী খবর যোগাযোগ করেন কর আইনজীবী তিমির মজুমদারের সঙ্গে। তিনি বলেন, গেল দুটি নির্বাচনে সোম নাথ দে নির্বাচনি হলফনায় যে সম্পদের পরিমাণ উল্লেখ করেছেন তা অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তার আয়কর রিটার্নের তথ্য অনুযায়ী বেশ কিছু তথ্য হাস্যকর। তার এবং তার পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয়ের তথ্য তদন্তের দাবি রাখে। 

দল পরিবর্তনের রাজনীতি
হলফনামা অনুযায়ী ‘ব্যবসায়ী’ সোম নাথ দে জাতীয় পার্টির মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে দলের বাগেরহাট জেলার ২০২২ সালের মোড়লগঞ্জ উপজেলা পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ৩৯ নম্বর সদস্যে নাম লেখান। 
ছাত্র-জনতার জুলাই আন্দোলনের আগেও যিনি ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা, তিনি ২০২৫ সালের  ২০ অক্টোবর অন্তত  বিশজনের মতো সনাতন ধর্মের অনুসারীকে নিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এদিন রাজধানীর গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে একটি অনুষ্ঠানে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের হাতে ফুল দিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। এরপর সোম নাথ দে খেলেন নির্বাচনের খেলা। বিএনপির হয়ে বাগিয়ে নেন দলীয় মনোনয়ন।
অনেকে দাবি, তিনি ইসকনের সদস্য ও তাদের মদদপুষ্ট হয়ে ভারতীয় বিভিন্ন প্রোপাগান্ডায় জড়িত। 

মামলা নিয়ে হলফনামায় ছলচাতুরি
সোম নাথ দে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় মামলা নিয়ে ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়েছেন। ২০১৮ সালের হলফনামায় তিনটি এনআই অ্যাক্ট মামলা উল্লেখ করেছেন। যে মামলাগুলো ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালে বলে দেখানো হয়েছে। যদিও এবারের হলফনামায় দেখা যায়, ২০১৫ সালে অবৈধ সম্পদ ক্রয়ের একটি মামলা উল্লেখ আছে, যা ২০১৮ সালে গোপন করেন তিনি। 


তার আগে ২০১২ সালের এনআই অ্যাক্টের আরও একটি মামলা ২০১৮ সালের হলফনামায় গোপন করে যান। এ ছাড়া একই আইনে আরও দুটি মামলাসহ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সোনাডাঙ্গা থানার একটি মামলা এখনও বিচারাধীন। আর ছাত্র-জনতার মামলা থেকে পেয়েছেন অব্যহতি।


ছাত্র-জনতা হত্যা মামলা থেকে অব্যহতি কি বিএনপির কাঁধে ভর দিয়ে?
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আত্মগোপনের পর অবস্থা বুঝে খোলস বদলানো সোমনাথ দে ছিলেন জুলাইয়ের ছাত্র-জনতা হত্যা মামলার আসামি। মামলাটি হয় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায়। মোড়লগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতিকদের অধিকাংশের ভাষ্য, বিএনপির কাঁধে ভর করে তিনি এ যাত্রাও নিজেকে বাঁচিয়ে নিয়েছেন। এই নিয়ে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যেও।

স্থানীয় নেতাকর্মীদের ক্ষোভ
মোরলগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাবিনা ইয়াসমিন গত বছরের ২৬ নভেম্বর তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন, ‘বাবু সোমনাথ দে মোড়েলগঞ্জ থেকে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তির এত টাকা এত দালান কোটা অট্টালিকা কোত্থেকে আসে এর বৈধতা নেওয়ার জন্য এখন আবার বিএনপি’র মনোনয়ন নেওয়ার জন্য পাঁয়তারা করছে। মোড়েলগঞ্জ সরণখোলার বিএনপি’র সকল নির্যাতিত নিপীড়িত কর্মীরা ধিক্কার প্রতিবাদ জানাই। বাবু সোমনাথ দে জাতীয় পার্টি থেকে আওয়ামী লীগের সদস্য হইল মোড়লগঞ্জে স্বর্ণকমল তৈরি করল এ দেখি এরশাদ শিকদারকে হার মানাইলো।’ 
রেজাউল আলম নামে স্থানীয় এক বিএনপি কর্মী জানান, আমাদের এই নির্বাচনি আসনে অনেক প্রবীণ-তরুণ যোগ্য ত্যাগী নেতৃত্ব রয়েছে। যারা শেখ হাসিনা, শেখ হেলালের বিরুদ্ধে নির্বাচনে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তাদের মধ্য থেকে যেকোনো একজনকে মনোনীত করলে এ আসনের মানুষ বিপুল ভোটে ধানের শীষের প্রার্থীকে নির্বাচিত করত। কিন্তু সোম নাথ দে’কে নমিনেশন দেওয়ার খবর নেতাকর্মীদের হতাশ করেছে। সারা বছর রাজপথে থেকে ১৭ বছর ঘুমাতে পারেননি তাদের অনেকেই। এখন উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন সোম নাথ দে।


বাগেরহাট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এ টি এম আকরাম হোসেন তালিম প্রভাতী খবরকে বলেন, সোম নাথ দে’কে মনোনয়ন দেওয়ায় অনেকের মাধ্যেই ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। এ বিষয়ে শরণখোলা-মোরলগঞ্জের অনেক নেতাকর্মী আমার কাছে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের বাইরে আমি কোনও মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। 
হলফনামায় কারচুপি প্রসঙ্গে নির্বাচন পর্যবেক্ষক
নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও সাবেক নির্বাচন সংস্কারবিষয়ক কমিশনের সদস্য ড. আব্দুল আলিম প্রভাতী খবরকে বলেন, কোনও প্রার্থী নির্বাচনি হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে বা কোনও তথ্য গোপন করলে তার অভিযোগের সত্যতা পেলে নির্বাচন কমিশন প্রার্থীতা বাতিল করতে পারে। এটা অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্বাচিত হওয়ার পরও হতে পারে। 

সোম নাথের বক্তব্য
অভিযোগ প্রসঙ্গে সোমনাথ দে প্রভাতী খবরকে বলেন, আমার কিছু বলার নেই, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে প্রশ্ন করেন। 

বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্য
সোম নাথের বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রভাতী খবরকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি বিশ্লেষণে নেব এবং যথাসময়ে আপনাদেরকে জানিয়ে দেব।’

অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে থাকছে সোম নাথের সাতটি ব্যাংক একাউন্টের চলমান চারটি ব‍্যাংক একাউন্টসহ বিক্রমপুর প্যারাডাইসের বিলাশবহল ফ্ল্যাট খবরাখবর। আর তৃতীয় ও শেষ পর্বে থাকবে ৮ হাজার ৫০০ স্কয়ার ফিট ভবন এবং আয়কর রিটার্নে গোপন করা নানা তথ্য।