চীনে আঘাত হেনেছে টাইফুন ‘বাভি’, টানা ভারী বৃষ্টির সতর্কতা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
চীনের মূল ভূখণ্ডে এ বছরের সবচেয়ে শক্তিশালী টাইফুন ‘বাভি’ আঘাত হেনেছে। রোববার দেশটির পূর্ব উপকূলে প্রবল বৃষ্টি ও ঘণ্টায় তীব্র গতির বাতাস নিয়ে আঘাত হানে ঝড়টি। এর প্রভাবে ব্যাপক জলাবদ্ধতা, গাছপালা উপড়ে পড়া, ভূমিধস এবং পরিবহন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ঝড়ের আগেই নিরাপত্তার স্বার্থে প্রায় ২০ লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
চীনের আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মূল ভূখণ্ডে প্রবেশের পর বাভির শক্তি কিছুটা কমে ক্রান্তীয় ঝড়ে (ট্রপিক্যাল স্টর্ম) পরিণত হলেও এটি এখনও বিশাল আকারের একটি আবহাওয়া ব্যবস্থা। পূর্ব ও উত্তর চীনের বিস্তীর্ণ এলাকায় আগামী কয়েক দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে ঝেজিয়াং প্রদেশ থেকে। চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রদেশেই প্রথম আঘাত হানে টাইফুনটি। স্থানীয় সময় শনিবার রাত ১১টা ২০ মিনিটের দিকে উপকূলীয় শহর ইউহুয়ানে প্রথম আঘাত হানার পর মধ্যরাতে ওয়েনঝৌ শহরের অংশ ইউয়েচিংয়ে দ্বিতীয়বার স্থলভাগে প্রবেশ করে বাভি।
ইউয়েচিংয়ের বাসিন্দা লি লিয়াংশিং বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ঝড়ের সময় বাতাস এতটাই শক্তিশালী ছিল যে ছাদের টাইলস ও গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
তিনি বলেন, ‘অবশ্যই ভয় পেয়েছিলাম। তবে আমরা সমুদ্রের পাশে থাকি, তাই এমন ঝড়ের সঙ্গে কিছুটা অভ্যস্ত।’
নিজের আবাসিক এলাকার পাশের একটি প্লাবিত খালের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘এখানে আগে হাঁটার রাস্তা ছিল, কিন্তু এখন পুরোটা পানির নিচে। এত উঁচু পানি আমি আগে কখনও দেখিনি।’
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, শুধু ইউয়েচিং শহরেই এক হাজার ৩০০টির বেশি গাছ ভেঙে পড়েছে, যার মধ্যে ৭০০টিরও বেশি গাছ শিকড়সহ উপড়ে গেছে। কোথাও কোথাও পানি গাড়ির চাকার অর্ধেক উচ্চতা পর্যন্ত উঠে যায়।
রোববার জরুরি উদ্ধারকর্মীরা খননযন্ত্র ব্যবহার করে পানিতে তলিয়ে যাওয়া সড়ক পরিষ্কার এবং উপড়ে পড়া গাছ অপসারণের কাজ শুরু করেন। শহরের পার্বত্য উত্তরাঞ্চলে ভূমিধসের ঘটনায় বড় বড় পাথর পাহাড়ি সড়কে গড়িয়ে পড়ে এবং ফুলে-ফেঁপে ওঠা নদীর পানিতে আশপাশের গাছপালা তলিয়ে যায়।
ইউহুয়ানের উপকূলীয় মাছ ধরার শহর কানমেনে ৭২ বছর বয়সী পার্সেল দোকান মালিক লিন ইয়ংজিন জানান, তার দোকানটি সরাসরি সমুদ্রের মুখোমুখি হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দোকানের প্রবেশপথের ধাতব কাঠামো ভেঙে পড়েছে এবং পাশের ভবনের একটি জানালা উড়ে গেছে। তার ধারণা, টাইফুনে অন্তত ৬ হাজার ইউয়ান (প্রায় ৮৮৫ মার্কিন ডলার) ক্ষতি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ঝড় উপকূলে আঘাত হানার পর আমাদের করার কিছু ছিল না। বৃষ্টির পানি ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। সারা রাত পানি সামলাতে হয়েছে, ভোর ৫টার আগে ঘুমাতেই পারিনি।’
বহু টাইফুনের অভিজ্ঞতা থাকা এই প্রবীণের মতে, ‘এটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী একটি টাইফুন। এটি ঠিক কানমেন দিয়েই স্থলভাগে প্রবেশ করেছে। আমরা ছিলাম এর সরাসরি পথের মধ্যে।’
চীনে প্রবেশের আগে শনিবার উত্তর তাইওয়ান অতিক্রম করে বাভি। সেখানে প্রবল বাতাস ও ভারী বৃষ্টিতে উত্তরাঞ্চলের মিয়াওলি কাউন্টির একটি এলাকায় প্রায় ৮০ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
তাইওয়ানের ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, মোট ১৩৪ জন আহত হয়েছেন। বেশিরভাগই মোটরসাইকেল থেকে পড়ে যাওয়া, পিছলে যাওয়া বা উড়ে আসা বস্তুর আঘাতে আহত হন। তবে কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। ঝড়ের কারণে রোববার ১৩৭টি আন্তর্জাতিক এবং ৬২টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
টাইফুনের প্রভাব পড়েছে চীনের পরিবহন ব্যবস্থাতেও। ঝেজিয়াংয়ের রাজধানী হাংজৌতে দুটি প্রধান রেলস্টেশনের সব ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে এবং শিয়াওশান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৩২৭টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। প্রতিবেশী সাংহাইয়ে বাতিল হয়েছে এক হাজার ৬২০টি ট্রেন এবং ৬৮৪টি ফ্লাইট।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বাভি দুর্বল হয়ে গেলেও এর বিশাল ঘূর্ণাবর্তের কারণে স্থলভাগের কয়েকশ কিলোমিটার ভেতরেও কয়েক দিনের মধ্যে কয়েকশ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে বন্যা, ভূমিধস এবং শহরাঞ্চলে ব্যাপক জলাবদ্ধতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এদিকে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, চলতি বছর এল নিনো আবহাওয়া পরিস্থিতির প্রভাবে চীনে আরও ঘন ঘন এবং শক্তিশালী চরম আবহাওয়া দেখা দিতে পারে। এল নিনোর কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং টাইফুনের গতিপথ পশ্চিম দিকে সরে চীনের উপকূলের দিকে ধাবিত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।