বিশ্ব

ইরানের বন্দরে ফের নৌ অবরোধ যুক্তরাষ্ট্রের, অবকাঠামোয় হামলার হুমকি

ইরানের বন্দরে ফের নৌ অবরোধ যুক্তরাষ্ট্রের, অবকাঠামোয় হামলার হুমকি

ইরানের বন্দরে ফের নৌ অবরোধ যুক্তরাষ্ট্রের, অবকাঠামোয় হামলার হুমকি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইরানের সব বন্দরে আবারও নৌ অবরোধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

সেই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তেহরান আলোচনায় না ফিরলে আগামী সপ্তাহে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুর মতো অবকাঠামোতে হামলা চালাবে মার্কিন বাহিনী।

রয়টার্স এক প্রতিবেদনে লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত নতুন করে তীব্রতা পাওয়ার পর এটি ওয়াশিংটনের সর্বশেষ বড় পদক্ষেপ।

এদিকে ইরানের বিভিন্ন স্থাপানায় আরো হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনী বলছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা করার যে সক্ষমতা তেহরানের রয়েছে, তা দুর্বল করাই হামলার লক্ষ্য।

অন্যদিকে তেহরান জানিয়েছে, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ফের সংঘাত শুরু হওয়ার পর তারা আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে।

কয়েক মাসের সংঘাতের পর গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, নতুন উত্তেজনায় তাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, (ইরানের) জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে শেষের জন্য রেখে দিচ্ছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেগুলোতেও হামলা হবে।

তারা যদি আলোচনার টেবিলে ফিরে না আসে, আগামী সপ্তাহে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু—সবই নিশানা করা হবে।

১৯৪৯ সালের জেনিভা কনভেনশন অনুযায়ী, বেসামরিক জনগণের জন্য অপরিহার্য স্থাপনায় হামলা করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থি।

ট্রাম্প বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকরা ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই বার্তা দিয়েছেন যে, তাদের অবশ্যই একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।

ইরানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, বুধবার ভোরে তারা জর্ডানের আজরাকে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

তবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পেন্টাগনের কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বলেছে, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের গুদামে হামলা চালিয়েছে।

আর কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানি ড্রোন প্রতিহত করেছে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, ইরানি হামলার পর একটি স্থাপনায় আগুন লাগার পর তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।

রয়টার্স লিখেছে, গত মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পথ খুলে দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে সন্দেহ তৈরি হয়েছে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার কারণে।

এই সংঘাত ইতোমধ্যে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।

ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেত।

যুক্তরাষ্ট্র বলছে, গত এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে সাতটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে প্রায় এক ডজন নাবিক হতাহত বা নিখোঁজ হয়েছেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে তাদের দুটি তেলবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ হামলায় একজন ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আরও আটজন আহত হন।

আইআরজিসি বলেছে, তাদের ‘সতর্কবার্তা’ অমান্য করায় দুটি সুপারট্যাংকারে হামলা চালিয়ে সেগুলো অচল করে দেওয়া হয়েছে। তবে জাহাজগুলোর নাম প্রকাশ করা হয়নি।

এর জবাবে ইরানে প্রতিদিনই হামলা করছে মার্কিন বাহিনী। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাতে মার্কিন হামলায় হরমুজ প্রণালির তীরবর্তী বন্দর আব্বাস ও দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক এলাকার কাছে বিস্ফোরণ হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে সামরিক অভিযান ও অর্থনৈতিক অবরোধ জোরদার করে আমাদের আবার আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে পারবে, তাহলে তারা ভুল করছে।"

উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে সোমবার ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ ট্রানজিট ফি আরোপের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। জাতিসংঘের নৌ সংস্থা ও বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে মঙ্গলবার তিনি সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন।

এর পরিবর্তে তিনি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তিনি বিনিয়োগ চুক্তির চেষ্টা করবেন। তবে কোনো দেশ এতে সম্মত হয়েছে কি না, কিংবা কোনো চুক্তি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু তিনি বলেননি।

ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় যাওয়া-আসা করা জাহাজের ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ মঙ্গলবার রাত ৮টা (গ্রিনিচ মান সময়) থেকে আবার কার্যকর হয়েছে। গত জুনে এটি সাময়িকভাবে তুলে নেওয়া হয়েছিল।

ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের জাহাজ ছাড়া অন্য সব দেশের জন্য হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত থাকবে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ২০টির বেশি যুদ্ধজাহাজ এবং শত শত সামরিক বিমান মোতায়েন রয়েছে।

রয়টার্স লিখেছে, দিন যত গড়াচ্ছে, এই যুদ্ধের প্রতি মার্কিন নাগরিকদের সমর্থন তত কমছে। নভেম্বরে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে বিষয়টি রাজনৈতিক চাপও তৈরি করছে।

রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেক মানুষ বলেছেন, এই যুদ্ধের যে মূল্য দিতে হয়েছে, তা সার্থক হয়নি।

সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম নতুন করে বাড়ছে। গত সাত দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ওয়েলের দাম ১৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৫ ডলারে পৌঁছেছে, যা জুনের মাঝামাঝি সময়ের পর সর্বোচ্চ।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) গত মাসে সতর্ক করে বলেছিল, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ের পরও যুদ্ধ চলতে থাকলে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কারণ জ্বালানির ধাক্কা সামাল দিতে অনেক দেশ ইতোমধ্যে তাদের কৌশলগত তেল মজুতের বড় অংশ ব্যবহার করে ফেলেছে।

ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই ইরান ও লেবাননের নাগরিক।

ওয়াশিংটন বারবার বলে আসছে, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে তেহরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।

ইরান চায়, তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হোক এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাক।