ক্যাডার বঞ্চিতের অভিযোগ, টানা ১২ দিনের আন্দোলনে শেকৃবি শিক্ষার্থীরা
শেকৃবি সংবাদদাতা:
ডিগ্রি জটিলতা ও ক্যাডার বঞ্চিতের অভিযোগ তুলে ত্দন্তের দাবিতে টানা ১২ দিনের মতো আন্দোলন করছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) এনিমেল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন (এএসভিএম) অনুষদের শিক্ষার্থীরা। ৪৭তম বিসিএসের টেকনিক্যাল ক্যাডারের ফল প্রকাশের পর ডিগ্রি জটিলতার কারণে ক্যাডার বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ তুলে গত ৫ জুলাই থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি পালন করছেন তারা।
বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীরা মাথায় লাল ফিতা বেঁধে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ, হিউম্যান নেমিং, গ্রাফিতি অঙ্কনসহ বিভিন্ন প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করছেন। টেকনিক্যাল ক্যাডারের ফলাফলে সম্ভাব্য কারিগরি ত্রুটির সুনির্দিষ্ট তদন্ত এবং বৈষম্য নিরসনের উদ্যোগ না নেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে জানান তারা।
শিক্ষার্থীদের দাবি, টেকনিক্যাল ক্যাডারের মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এএসভিএম অনুষদের প্রায় ১৮ জন পরীক্ষার্থীর কেউই চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হননি। তাঁদের অভিযোগ, আবেদন কোড বা অন্য কোনো কারিগরি জটিলতার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
যদিও এ বিষয়ে এখনো বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি।
শেকৃবির এই আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়েছে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়,হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের বিভিন্ন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি মেডিসিন ও এনিম্যাল সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে মানববন্ধন ও বিবৃতির মাধ্যমে তারা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান।
১৮ জন ভাইভা দেওয়ার পরেও কেউ সুপারিশপ্রাপ্ত না হওয়ার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৪৭তম বিসিএসে শেকৃবি থেকে প্রায় ৪০ জন বিভিন্ন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
তবে এএসভিএম অনুষদের প্রায় ১৮ জন শিক্ষার্থী প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে টেকনিক্যাল ক্যাডারের মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিলেও প্রকাশিত ফলাফলে ৭১টি টেকনিক্যাল ক্যাডার পদের একটিতেও তাদের নাম আসেনি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এতসংখ্যক পরীক্ষার্থী চূড়ান্ত মৌখিক পরীক্ষা দেওয়ার পরও একজনও সুপারিশপ্রাপ্ত না হওয়ায় বিষয়টি স্বাভাবিক নয় এবং এটি তদন্তের দাবি রাখে।
আবেদনের ক্ষেত্রে নতুন সংযোজিত কোড নিয়ে মূলত সমস্যা হয়ে থাকতে পারে এমন অভিযোগ করে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলেন, ৪৭তম বিসিএসে প্রথমবারের মতো কম্বাইন্ড ডিগ্রিধারীদের জন্য পৃথক আবেদন কোড (৬৪৭) সংযোজন করা হয়। এর আগে ৪৬তম বিসিএস এবং ৪৭তম বিসিএসের প্রাথমিক বিজ্ঞপ্তিতে এ ধরনের কোনো কোড ছিল না। সংশোধিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নতুন কোড চালুর ফলে আবেদন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসে।
শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা, এই পরিবর্তনের সঙ্গে টেকনিক্যাল ক্যাডারের ফলাফলের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
তবে শুধু বিসিএস নয়, কম্বাইন্ড ডিগ্রিধারী শিক্ষাথীদের নিয়োগের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। এ বিষয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলেন, সমস্যা শুধু ৪৭তম বিসিএসে সীমাবদ্ধ নয়। কম্বাইন্ড ডিগ্রি চালুর প্রায় দেড় দশক পরও পশুপালন ও ভেটেরিনারি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি চাকরি এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁরা কাঙ্ক্ষিত সুযোগ পাননি।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)সহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় ধরে এএসভিএম ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ হয়নি। এমনকি বহু নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আবেদন করার সুযোগ থেকেও তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন।
কম্বাইন্ড ডিগ্রিধারী রাকিব নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছি। আমাদের ডিগ্রির সঙ্গে সম্পর্কিত গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশে দীর্ঘদিন একজনকেও নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এখন সেই বৈষম্যের তালিকায় পিএসসিও যুক্ত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। আমরা এর সুষ্ঠু তদন্ত ও স্থায়ী সমাধান চাই।’
আন্দোলন কর্মসূচির ৪ দফা দাবি সম্পর্কে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেন, টেকনিক্যাল ক্যাডারের ফলাফল পুনর্মূল্যায়ন, সম্ভাব্য কারিগরি ত্রুটি তদন্ত এবং কম্বাইন্ড ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ-সংক্রান্ত বৈষম্য স্থায়ীভাবে দূর করতে হবে। দাবি পূরণ না হলে 'লং মার্চ টু পিএসসি' ও 'লং মার্চ টু বিএলআরআই'-সহ আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে একাধিক দফায় বৈঠক করেছে। উপাচার্যের তত্ত্বাবধানে গঠিত একটি কমিটি বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের অনুরোধ জানিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ বলেন,‘বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত হয়েছি। ইতোমধ্যে পিএসসির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অনুসন্ধান এবং ডিগ্রির কোড-সংক্রান্ত সম্ভাব্য সমস্যা পর্যালোচনার আশ্বাস দিয়েছে। বিষয়টি সময়সাপেক্ষ হলেও আমরা ইতিবাচক সমাধানের প্রত্যাশা করছি। পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বরত কর্তৃপক্ষের কাছেও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।’