নিজস্ব প্রতিবেদক:
সংবাদ সংগ্রহে গিয়ে দুই সাংবাদিকের ওপর হামলা, ক্যামেরাসহ পেশাগত সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেওয়া, মোটরসাইকেল ভাঙচুর এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) এবং বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ)। পৃথক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠন দুটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ডিআরইউর সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল এবং বিএসআরএফের সভাপতি মাসউদুল হক ও সাধারণ সম্পাদক উবায়দুল্লাহ বাদল স্বাক্ষরিত পৃথক বিবৃতিতে বলা হয়, ডিআরইউর স্থায়ী সদস্য ও বাংলা অ্যাফেয়ার্স সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম (রাজু হামিদ) এবং তার সঙ্গে থাকা অপর এক সংবাদকর্মী শনিবার দুপুরে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার গঙ্গাধরপট্টি এলাকায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে হামলার শিকার হন।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে অভিযোগ করা হয়, তথ্য সংগ্রহের একপর্যায়ে নবাবগঞ্জ উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার নাজমুল হাসান, আল মামুন এবং তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে অতর্কিত হামলার অভিযোগ ওঠে। হামলার সময় সাংবাদিকদের ব্যবহৃত একটি ক্যানন ৭১০০ মডেলের ক্যামেরা, বয়া (বুম) মাইক্রোফোন, ট্রাইপড ও নগদ অর্থ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পাশাপাশি একটি টিভিএস মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। এছাড়া সাংবাদিকদের প্রাণনাশ এবং লাশ গুমের প্রকাশ্য হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
ডিআরইউ তাদের বিবৃতিতে জানায়, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, সংবাদ সংগ্রহের সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেওয়া এবং ভীতি প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের ঘটনা শুধু একজন সাংবাদিকের ওপর হামলা নয়, বরং স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপরও সরাসরি আঘাত। সংগঠনটি জানায়, এ ঘটনায় যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে সাংবাদিক সমাজকে সঙ্গে নিয়ে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে বিএসআরএফ জানায়, সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের বাধাগ্রস্ত করা, হামলা চালানো, সংবাদ সংগ্রহের সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেওয়া এবং মোটরসাইকেল ভাঙচুর কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সংগঠনটি দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে বলেছে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সাংবাদিক সমাজকে সঙ্গে নিয়ে কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
দুই সংগঠনই জানিয়েছে, এ ঘটনায় মানিকগঞ্জ থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তারা আশা প্রকাশ করেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনার সত্যতা উদঘাটন করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনবে।
ঘটনা-সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধানে জানা গেছে, হামলার শিকার সাংবাদিকরা নবাবগঞ্জ ও ধামরাই উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সাব-রেজিস্ট্রার নাজমুল হাসানের সম্পদ, আয় এবং বিভিন্ন স্থাবর সম্পত্তি-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করছিলেন। স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত তথ্য, জমি-সংক্রান্ত নথি এবং একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে সরকারি চাকরির তুলনায় তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্থাবর সম্পদ থাকার অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া এলাকায় জমি, ফ্ল্যাট এবং পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন সম্পদের দাবিও উঠে এসেছে। এসব তথ্য অভিযোগ ও অনুসন্ধানের অংশ; এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে কোনো সাংবাদিকের ওপর হামলা কেবল একজন ব্যক্তির ওপর আক্রমণ নয়; এটি সংবিধানস্বীকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকারের ওপরও আঘাত। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক, বাক্স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, সম্পদ নষ্ট, ছিনতাই, প্রাণনাশের হুমকি ও বেআইনি বাধা সৃষ্টি—এসব অপরাধের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনিয়ারা খানম বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে কোনো সাংবাদিকের ওপর হামলা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকারের ওপর আঘাত। তার মতে, হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, সংবাদ সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি কিংবা পেশাগত সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইনে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
অভিযোগ ও অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে সাব-রেজিস্ট্রার নাজমুল হাসান বলেন, “উক্ত বিষয় সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।” এ কথা বলেই তিনি মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।