গাজীপুর প্রতিনিধি:
গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রার মো. মিজানুর রহমান এবং গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল বাতেনের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, দলিলের মূল্য ও জমির শ্রেণি নিয়ে অনিয়ম এবং দালালচক্রকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, দলিল নিবন্ধনের বিভিন্ন ধাপে সরকারি নির্ধারিত ফি ও কমিশনের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাদের ফাইল আটকে রেখে অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অনুসন্ধানে পাওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, গাজীপুর জেলা ও সদর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে দীর্ঘদিন ধরে একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও চিহ্নিত দালালের সমন্বয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দলিল নিবন্ধনের বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, জমির শ্রেণি নিয়ে অনিয়ম এবং সরকারের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, দলিলপ্রতি অফিস খরচের নামে নির্ধারিত কমিশনের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। রেজিস্ট্রি অফিসের একশ্রেণির চিহ্নিত দালালের সহায়তায় জমির শ্রেণি পরিবর্তন বা জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, বেশি মূল্যে নিবন্ধিত বায়না দলিলের তথ্য গোপন করে পরবর্তীতে কম মূল্যে সাব-কবলা দলিল সম্পাদনের সুযোগ তৈরি করা হয়। এ ধরনের কার্যক্রমের বিনিময়ে চুক্তিভিত্তিক মোটা অঙ্কের ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, দলিলদাতা বা দলিলগ্রহীতার আয়কর-সংক্রান্ত টিআইএন বা টিন রিটার্ন না থাকলে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়। হেবা দলিলের ক্ষেত্রে জমির পরিমাণ ১০ শতাংশ পর্যন্ত হলে ১০ হাজার টাকা এবং ১০ শতাংশের বেশি হলে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন কোম্পানির ব্যাংক মর্টগেজ দলিলে ঋণের পরিমাণ অনুযায়ী ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বণ্টননামা দলিলের ক্ষেত্রে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা এবং ভুল সংশোধন ও ঘোষণাপত্রসংক্রান্ত দলিলের ক্ষেত্রে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এসব অর্থ সরকারি নির্ধারিত ফি বা সেবামূল্যের বাইরে নেওয়া হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও আর্থিক লেনদেনের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জেলা রেজিস্ট্রার মো. মিজানুর রহমানের আইন মন্ত্রণালয়ে শক্তিশালী যোগাযোগ ছিল। কয়েকজন প্রভাবশালী সাব-রেজিস্ট্রার তাঁর নেপথ্যের প্রভাবক বা পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এই চক্রের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ওমেদার সোহেল, কাশেম, রিপন ও রাব্বির নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার মো. মনিরুল ইসলামের সময় থেকে অফিসের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব বজায় রেখে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে আসছেন। স্থানীয়ভাবে সোহেলকে দালাল সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বালাম বই থেকে নকল বা সত্যায়িত অনুলিপি নিতে সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা উৎকোচ দিতে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অতিরিক্ত অর্থ না দিলে সংশ্লিষ্ট ফাইল বা আবেদন দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হয়। এতে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি বাড়ছে এবং প্রয়োজনীয় নথি পেতে বিলম্ব হচ্ছে।
মারিয়ালীতে রেকর্ড রুম স্থানান্তরকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের জেরে গত ৬ সেপ্টেম্বর থেকে জেলা ও সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নকলসংক্রান্ত কার্যক্রম মৌখিক নির্দেশে বন্ধ রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে দলিলের নকল ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে আসা সেবাগ্রহীতাদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
গাজীপুর সদর, সালনাসহ বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও উপ-কার্যালয়ে জমির দলিল করতে আসা সাধারণ নাগরিকদের একটি শক্তিশালী অঘোষিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। টিআইএন সনদের অজুহাত, দলিলের ছোটখাটো ভুলত্রুটি দেখানো কিংবা জমির শ্রেণি পরিবর্তনের বিষয় সামনে এনে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, জমির শ্রেণি ও মূল্য নিয়ে অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার পাশাপাশি সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকেও অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে দলিলের মূল্য নির্ধারণ, জমির শ্রেণি, সরকারি ফি এবং নিবন্ধনসংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে গাজীপুরের সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রি অফিসে প্রায় ১৩ কোটি টাকার অডিট আপত্তি এবং নথিপত্রে ব্যাপক অসংগতি ধরা পড়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে দুদকের সংশ্লিষ্ট নথি বা দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বক্তব্য এই প্রতিবেদনের সময় পাওয়া যায়নি।
সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার মো. মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে কম মূল্যে জমি নিবন্ধন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে দুদকের মামলা এবং হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্তের বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। তবে এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ও আদালতের আদেশ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাবেক যুগ্ম সাব-রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে অফিসের সিন্ডিকেট ও বিভিন্ন অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সোহেল, কাশেম, রিপন ও রাব্বিকে নিয়ে গঠিত ওমেদার চক্রের বিরুদ্ধে খাস কামরার কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার এবং সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের দাবি, দালালচক্র ও অনিয়মের হাত থেকে সেবাগ্রহীতাদের রক্ষা করতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ডিজিটাল ফাইলিং ব্যবস্থা চালু এবং দলিল নিবন্ধনের সব ধরনের সরকারি ফি ও সেবামূল্য প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের মতে, জেলা ও সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আইন মন্ত্রণালয়ের কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। অভিযোগের সঙ্গে জড়িত বলে প্রমাণিত কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী বা দালালের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল বাতেনকে একাধিকবার মুঠোফোনে কল করা হলেও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকবার কল কেটে দেওয়া হয়। পরবর্তীতেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।
গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রার মো. মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁর সহকারী মুঠোফোনে কল গ্রহণ করে জানান, ‘স্যার ব্যস্ত আছেন। আপনাকে কল দিয়ে ধরিয়ে দেব, তারপর স্যারের সঙ্গে কথা বলবেন।’ তবে এরপর একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও জেলা রেজিস্ট্রারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তা বা অভিযোগে উল্লিখিত অন্য ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।