অপরাধ

সংরক্ষিত বনে ভবন নির্মাণে বন বিভাগের বাধা

সংরক্ষিত বনে ভবন নির্মাণে বন বিভাগের বাধা

কাপ্তাই প্রতিনিধি :

কাপ্তাই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সীতা পাহাড়ে অবৈধভাবে তিনতলা ভবন নির্মাণের কাজে বন বিভাগ বাধা দেওয়ায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বন বিভাগ। ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল এবং অবৈধ কার্যক্রমকে আড়াল করে ফায়দা লুটার উদ্দেশ্যে মহলটি সক্রিয় হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

কাপ্তাই বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি রাঙামাটি দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন কাপ্তাই বন রেঞ্জের রামপাহাড় বন বিটের সীতা পাহাড় ব্লকের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে একটি তিনতলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। খবর পেয়ে কাপ্তাই বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৫ থেকে ১৬ বছর আগে রাঙামাটি দক্ষিণ বন বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) অসিত রঞ্জন পালের দায়িত্বে থাকাকালে ধ্যানের জন্য সীতা পাহাড়ে একটি ছোট ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। বর্তমানে যে স্থানে বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটি এশীয় হাতির প্রধান আবাসস্থল। লোকালয় থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সীতা পাহাড় এলাকাটি বন্যহাতির পাল নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।

বন বিভাগ জানিয়েছে, এমন সংবেদনশীল ও সংরক্ষিত এলাকায় নতুন করে কোনো বহুতল স্থাপনা নির্মাণ আইনগতভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কাপ্তাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. জামাল হোসেন তালুকদার বলেন, “অবৈধভাবে হাতির আবাসস্থলে নতুন স্থাপনা নির্মাণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বন আইন অনুযায়ী অবৈধ নির্মাণকাজ বন্ধ করায় একটি সুবিধাভোগী চক্র বিষয়টি নিয়ে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।”

কাপ্তাই রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মামুনুর রহমান জানান, মন্দিরটি জাঁকজমকপূর্ণ করা এবং পূজারীসহ লোকসমাগম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে সরকারি আইনের তোয়াক্কা না করে রাঙামাটি জেলা পরিষদ থেকে সীতা পাহাড় মন্দির প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২২ সালে তৎকালীন সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, এ উদ্যোগ ১৯২৭ সালের বন আইনের ২৬ নম্বর ধারার ১(ক), ১(ঘ) ও ১ক(ঙ)-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন। এ ছাড়া জাতীয় বননীতি ২০২৫-এর ১(৫) ধারায় প্রাকৃতিক বনভূমি বনবিরুদ্ধ বা বনবহির্ভূত কাজে ব্যবহার বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে।

বন বিভাগের ওই কর্মকর্তা প্রশ্ন তোলেন, আইন প্রণয়নের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি ও সরকারি বিভাগগুলো কীভাবে সংরক্ষিত বনের ভেতরে এ ধরনের প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ ও উদ্বোধন করেন। তাঁর মতে, এ ধরনের উদ্যোগ প্রকারান্তরে রাষ্ট্রের স্বার্থহানির কারণ হতে পারে।

নির্মাণকাজ বন্ধে বিলম্বের বিষয়ে জানতে চাইলে রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মামুনুর রহমান জানান, জনবল সংকটের কারণে অনেক সময় প্রত্যন্ত অঞ্চলের ঘটনা দেরিতে নজরে আসে। তবে তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বন বিভাগ কঠোর অবস্থান নেয় এবং নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়।

এর আগে ২০২৫ সালে কাপ্তাই রেঞ্জের শুকনোছড়ি বিটে একটি মাদ্রাসা ও মসজিদ নির্মাণকাজ বন্ধ করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে সূত্র জানিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মীয় উপাসনালয় অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে বন বিভাগকে অনেক সময় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। বনভূমি সুরক্ষা এবং যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক এড়াতে যত্রতত্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।