সোহেল আহমেদ, বিশেষ সংবাদদাতা (শরণখোলা, বাগেরহাট):
বাগেরহাটের শরণখোলায় থানা পুলিশের এক সাহসিক ও শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে মাদক ব্যবসার অভিযোগে অভিযুক্ত ইলিয়াস তালুকদার (৪৩) গ্রেপ্তার হয়েছেন। অভিযানের সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি পাশের নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তবে পুলিশের কৌশলী তৎপরতা ও নিবিড় নজরদারির ফলে শেষ পর্যন্ত তাকে আটক করা সম্ভব হয়। পরে তার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে দা, চাপাতি ও চাইনিজ কুড়ালসহ একাধিক দেশীয় ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
রোববার (২ আগস্ট) বিকেলে উপজেলার রায়েন্দা বাজারের ওয়াপদা কলোনি এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করে শরণখোলা থানা পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়া ইলিয়াস তালুকদার ওই এলাকার মৃত হাসেম তালুকদারের ছেলে।
পুলিশ জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। পুলিশের একটি দল বাড়ি ঘিরে ফেললে ইলিয়াস বাউন্ডারি টপকে নদীতে নেমে আত্মগোপনের চেষ্টা করেন। কিন্তু দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর নদী থেকেই তাকে আটক করা হয়। পরে তার বাড়ি থেকে দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে ইলিয়াসের বিরুদ্ধে। অতীতেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলে স্থানীয় সূত্র জানায়। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে শরণখোলা থানায় একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা নাঈম প্রভাতী খবরকে বলেন,
“দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদকসেবী ও বখাটেদের আনাগোনা বেড়ে গিয়েছিল। এই গ্রেপ্তারের পর এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।”
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে শরণখোলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রোকেয়া খানম জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
বিশিষ্টজনদের মতামত
বাগেরহাট জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট এম. এ. অদুদ মুক্তা বলেন,
“শরণখোলা থানার ওসির প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে—যে-ই হোক, মাদকসেবী কিংবা মাদক ব্যবসায়ী, তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস নয়। অপরাধী যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ও কঠোর ভূমিকার কোনো বিকল্প নেই।”
জাতীয়তাবাদী তাঁতী দলের কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ড. কাজী মো. মনিরুজ্জামান মনির বলেন,
“শরণখোলা থানার ওসি কে ভুলভাবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
যখনই বড় ধরনের মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে তখনই এই ষড়যন্ত্রকারীরা অপপ্রচার চালাচ্ছে।
মাদক মুক্ত সমাজ ও রাস্ট্র গঠতে যেই ষড়যন্ত্র করবে তাকেও আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে।
শরনখোলা ওসির মাদক ব্যবসায়ী ধরার কৌশলকে অন্য রকম প্রচার করার সুযোগ নাই”
কেন বারবার জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়ায়?
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনিয়ারা খানম প্রভাতী খবরকে বলেন, "ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় জামিন একটি আইনি অধিকার, তবে সেটি মামলার প্রকৃতি, তদন্তের অগ্রগতি ও আদালতের বিবেচনার ওপর নির্ভর করে। কোনো ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পেলেই তিনি নির্দোষ বা দোষী—কোনোটিই প্রমাণিত হয় না; বিচার শেষে আদালতের রায়ই চূড়ান্ত"।
মনিয়ারা খানম বলেন, "একই ধরনের অপরাধে পুনরায় জড়িয়ে পড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ ভূমিকা রাখতে পারে—
দীর্ঘসূত্রিতাপূর্ণ বিচারপ্রক্রিয়া;
তদন্তে দুর্বলতা বা পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাব;
সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের প্রভাব;
স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের সহায়তা;
পুনর্বাসন ও কার্যকর নজরদারির ঘাটতি"।
আইনজীবী মনিয়ারা খানম আরো বলেন,
“মাদক-সংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তারের পাশাপাশি শক্তিশালী তদন্ত, নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হলে এবং বিচারপ্রক্রিয়া কার্যকর হলে সংঘবদ্ধ মাদকচক্রের কার্যক্রম অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।”
সাবেক নারী পুলিশ কর্মকর্তার মূল্যায়ন
দেশের প্রথম নারী ওসি (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হোসনে আরা বেগমের মতে,
“মাদকবিরোধী অভিযানে শুধু সাহস নয়, কৌশল, ধৈর্য এবং সঠিক গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয় জরুরি। কোনো অভিযুক্ত পালানোর চেষ্টা করলে পরিস্থিতি বুঝে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নিরাপদ উপায়ে তাকে আটক করা একজন দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তার পেশাগত সক্ষমতার পরিচয়। নারী কর্মকর্তা হিসেবে এমন অভিযান পরিচালনা এবং আইনানুগভাবে আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা নিঃসন্দেহে পেশাদারিত্বের উদাহরণ।
মাদক নির্মূলে করণীয়
অপরাধবিজ্ঞানী ও আইন বিশ্লেষকদের মতে, কেবল গ্রেপ্তার অভিযান নয়—সংঘবদ্ধ মাদকচক্রের অর্থায়ন বন্ধ, সাক্ষী সুরক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে মাদকের বিস্তার কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। একই সঙ্গে প্রতিটি অভিযান ও বিচারপ্রক্রিয়ায় আইন ও মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণ করা অপরিহার্য।
শরণখোলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রোকেয়া খানম প্রভাতী খবরকে বলেন,
"অভিযুক্ত মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করতে আমি এবং আমার টিম সম্পূর্ণ পেশাদারিত্ব, গোয়েন্দা তথ্য ও নিজস্ব কৌশল কাজে লাগিয়েছি। অভিযানের প্রতিটি ধাপ আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, অভিযানের পরপরই আমার কৌশলগত ফোনালাপ বিকৃত বা সম্পাদনা করে একটি কথোপকথনের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। আমার বিশ্বাস, এটি একটি সুপরিকল্পিত অপপ্রচার এবং মাদকবিরোধী অভিযানের সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা। তবে কোনো অপপ্রচার, ভয়ভীতি বা ষড়যন্ত্র আমাকে আমার পেশাগত দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখতে পারবে না। বাংলাদেশ পুলিশের একজন সদস্য হিসেবে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মাদক, সন্ত্রাস ও সব ধরনের অপরাধ দমনে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা আমার সাংবিধানিক ও পেশাগত দায়িত্ব। যে-ই অপরাধ করুক, যে-ই মাদক ব্যবসা বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকুক না কেন, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত থাকবে। আইনের চোখে সবাই সমান, এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে আমি ও আমার টিম দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।