আইন ও আদালত

সিন্ডিকেট-মজুদদারির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি

সিন্ডিকেট-মজুদদারির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশের বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মূল্য বাড়ানো, সিন্ডিকেট গঠন এবং মজুদদারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, বাজারে কোনো সিন্ডিকেট কৃষক বা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ব্যবসা করতে পারবে না। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রয়োজন হলে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রয়োগ করা হবে।

শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে ঝিনাইদহের শৈলকুপায় পাট ও পেঁয়াজের পাইকারি হাট ও আড়ত পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী। এ সময় তিনি বাজারের পণ্য সরবরাহ, কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কেনার প্রক্রিয়া এবং পাইকারি পর্যায়ের ব্যবসা পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, কোনো ব্যবসায়ী বা গোষ্ঠী বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কৃষককে কম দামে পণ্য বিক্রিতে বাধ্য কিংবা ভোক্তার কাছে অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রির সুযোগ নিতে পারবে না। বাজারে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃষককে জিম্মি করে রাখার প্রবণতা বন্ধ করতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। কৃষক যেন তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পান, সেটিও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে তিনি জানান।

মজুদদারির বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে মজুদদারির জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে। ফলে যারা অবৈধভাবে পণ্য মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করবেন, তাদের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

বাজারে কোনো পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও যদি একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে পণ্য আটকে রাখে, তাহলে সরবরাহ কমে গিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে। এর সুযোগে দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে সাধারণ ভোক্তার ওপর। একই সঙ্গে উৎপাদক কৃষকও ক্ষতিগ্রস্ত হন। কারণ উৎপাদনের সময় কৃষক কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হলেও পরবর্তী সময়ে মধ্যস্বত্বভোগী বা মজুদকারীর নিয়ন্ত্রণে একই পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে কৃষক ও ভোক্তা—দুই পক্ষের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে পাট ও পেঁয়াজের মতো কৃষিপণ্যের বাজারে উৎপাদক পর্যায় থেকে পাইকারি ও খুচরা পর্যায় পর্যন্ত দামের পার্থ্য, মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা এবং মজুদের বিষয়টি নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে এর আগে বিভিন্ন সময় বাজারে সিন্ডিকেট ও মজুদদারির বিরুদ্ধে অভিযান, জরিমানা ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। তবে বাজারে স্থায়ী শৃঙ্খলা ফেরাতে শুধু অভিযান নয়, পণ্যের সরবরাহ, মজুদ সক্ষমতা, আমদানি-রপ্তানি পরিস্থিতি, উৎপাদন ব্যয় ও পাইকারি-খুচরা দামের পার্থক্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ।

এ ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত বাজারদর পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রণালয় বিভিন্ন পণ্যের দাম নিয়ে সাপ্তাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। সর্বশেষ প্রকাশিত তালিকায় ২৩ জুলাই ২০২৬-এর দ্রব্যমূল্যের হ্রাস-বৃদ্ধি সংক্রান্ত সাপ্তাহিক প্রতিবেদনও রয়েছে।

বাজারে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যকার অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগী কমানো, সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো এবং বাজারে তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ কৃষিপণ্য দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় অনেক কৃষক উৎপাদনের পরপরই পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। তখন স্থানীয় বাজারে একসঙ্গে বেশি সরবরাহ তৈরি হলে দাম পড়ে যেতে পারে। বিপরীতে পরবর্তী সময়ে সরবরাহ কমলে একই পণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

আইনমন্ত্রীর শৈলকুপার বাজার পরিদর্শনের সময় দেওয়া বক্তব্য তাই শুধু মজুদদারির বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা নয়; কৃষক যাতে বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেই বিষয়টিও সামনে এনেছে। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, বাজারে কোনো গোষ্ঠী প্রভাব বিস্তার করে কৃষককে জিম্মি করলে তা বরদাশত করা হবে না।

বিশেষ ক্ষমতা আইনের প্রয়োগের হুঁশিয়ারির কারণে অবৈধ মজুদ, কৃত্রিম সংকট এবং বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত তৎপরতা আরও জোরদার হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে বাস্তবে এ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে বাজার নজরদারি, অবৈধ মজুদের তথ্য শনাক্তকরণ, প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর।

সর্বশেষ পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাজারে সরবরাহ ও দামের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখা। একদিকে কৃষককে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য দিতে হবে, অন্যদিকে ভোক্তার নাগালের মধ্যে রাখতে হবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনতে সিন্ডিকেট, মজুদদারি ও কৃত্রিম সংকটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারও প্রয়োজন।

আইনমন্ত্রীর সতর্কবার্তায় আপাতত স্পষ্ট হয়েছে—কৃষক বা ভোক্তাকে জিম্মি করে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিশেষ করে অবৈধ মজুদদারির ক্ষেত্রে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রয়োগের কথা সরাসরি জানানো হয়েছে। ফলে আগামী দিনে বাজারে নজরদারি ও আইন প্রয়োগ কতটা দৃশ্যমান হয়, সেটিই সরকারের এই কঠোর অবস্থানের বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হবে।