অপরাধ

রেকর্ড রুমে মাসে কোটি টাকার কারসাজির অভিযোগ

রেকর্ড রুমে মাসে কোটি টাকার কারসাজির অভিযোগ

গাজীপুর প্রতিবেদক:

গাজীপুর জেলা ও সদর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে ঘুষ বাণিজ্য, অতিরিক্ত ফি আদায় এবং বহিরাগত দালালদের একটি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে দলিলপ্রতি অতিরিক্ত অর্থ আদায়, জমির শ্রেণি ও মূল্য কম-বেশি দেখানো, রেকর্ড রুমে নকল ও সার্টিফায়েড কপি সরবরাহে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া এবং অফিস স্থানান্তরের নামে অর্থ আদায়ের মতো অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। একই সঙ্গে প্রায় এক দশক ধরে প্রাতিষ্ঠানিক অডিট না হওয়ায় অনিয়ম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে দুদকের এক অভিযানে গাজীপুর জেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে অনিয়মের পাশাপাশি প্রায় ১৩ কোটি টাকার অডিট আপত্তির তথ্য সামনে আসে।

অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রার মোঃ মিজানুর রহমান, সদর সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল বাতেন, সাবেক যুগ্ম সাব-রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলম এবং উমেদার সোহেল, কাশেম, রিপন ও রাব্বির নাম এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, দালালদের মাধ্যমে সেবা নিয়ন্ত্রণ এবং রেকর্ড রুমকেন্দ্রিক অবৈধ লেনদেন। তবে অভিযোগগুলোর প্রতিটি বিষয়ে পৃথকভাবে প্রমাণ বা দায় নির্ধারণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তসাপেক্ষ।

অভিযোগ রয়েছে, জেলা রেজিস্ট্রার মোঃ মিজানুর রহমান ও সদর সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল বাতেনের সময়ে দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়। জমির শ্রেণি ও বাজারমূল্য কম দেখানোর নামে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন এবং দলিলের মূল্য কম-বেশি দেখিয়ে রাজস্ব কমানোর সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে এসবের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

প্রতিবছর অডিট হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘ এক দশক ধরে অফিস দুটির প্রাতিষ্ঠানিক অডিট না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে আর্থিক অনিয়ম ও হিসাবের বাইরে অর্থ লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল গাজীপুর জেলা দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযানের সময় সহকারী পরিচালক মো. এনামুল হক জানিয়েছিলেন, ২০১৪ সালের পর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে মাত্র একবার অডিট হয়েছে এবং ওই অডিটে ১৩ কোটি টাকার অডিট আপত্তি রয়েছে।

দলিল লেখক সমিতির রেজুলেশনে সাবেক যুগ্ম সাব-রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলমের সময় অফিস স্থানান্তরের নামে ৪৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত গ্রহণের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দলিল লেখক সমিতির সভাপতি মজিবুর রহমান দাবি করেছিলেন, অফিস স্থানান্তরের খরচ বাবদ সমিতির পক্ষ থেকে ওই অর্থ দেওয়া হয়েছিল এবং টাকা কেউ আত্মসাৎ করেননি। ফলে ৪৭ লাখ টাকা গ্রহণের বিষয়টি থাকলেও অর্থের প্রকৃত ব্যবহার ও দায় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন।

রেকর্ড রুম ও নকল তোলার কার্যক্রম ঘিরেও বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৫০০টি আবেদন জমা পড়ে এবং মাস শেষে এসব আবেদন থেকে প্রায় ৯০ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন হয়। পুরনো বালাম বই বের করার জন্য সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

নকল ও সার্টিফায়েড কপি পেতে সরকারি নির্ধারিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন সেবাপ্রার্থীরা। প্রতিদিন শত শত আবেদন থেকে লাখ লাখ টাকা হিসাবের বাইরে নেওয়া এবং ওই অর্থ কর্মকর্তা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্রের দাবি, অফিসের প্রতিটি টেবিলেই ঘুষের নির্দিষ্ট রেট রয়েছে।

এর আগে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে গাজীপুর রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের রেকর্ড রুমে নকলপ্রতি নির্ধারিত অর্থের বাইরে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল। সেখানে দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০টি নকলের আবেদন এবং মাসে ৮ হাজার থেকে ১১ হাজার আবেদন জমা পড়ার কথা উল্লেখ করা হয়। একই প্রতিবেদনে নকলপ্রতি গড়ে ৮৫০ টাকা করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ তুলে মাসে পৌনে এক কোটি টাকার বেশি অবৈধ লেনদেনের হিসাব দেওয়া হয়েছিল।

সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, সরাসরি জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয় বা সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গেলে নানা অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয়। দালালের মাধ্যমে না এলে মাসের পর মাস ঘুরেও দলিল হাতে পাওয়া যায় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে দলিল নিবন্ধন ও নামজারির কাজ করানো এবং নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট ও ভেন্ডার সমিতির মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহের অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, অফিস কক্ষ ও খাস কামরায় বহিরাগত দালালদের অবাধ যাতায়াত রয়েছে। অফিসের স্টাফ ও বহিরাগত দালালদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পুরো কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে বলে অভিযোগ করেছেন সেবাপ্রার্থীরা। উমেদার ও দালালদের খাস কামরা ঘিরে অর্থ আদায়ের কার্যক্রম চলার অভিযোগও রয়েছে।

উমেদার সোহেলকে সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার মনিরুলের সহযোগী হিসেবে পরিচিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সোহেল ছাড়াও কাশেম, রিপন ও রাব্বির বিরুদ্ধে খাস কামরার কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন হলেও তাদের প্রত্যেকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মারিয়ালীতে রেকর্ড রুম স্থানান্তরকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের কারণে দীর্ঘদিন সাধারণ মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত ও চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। রেকর্ড রুম স্থানান্তরের পর সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও দালালনির্ভরতার অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন সেবাপ্রার্থী।

গাজীপুরের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অনিয়ম নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রেকর্ড রুমে নকল তোলার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং অফিস স্থানান্তরের খরচ বাবদ ৪৭ লাখ টাকা দেওয়ার অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের অভিযানে প্রায় ১৩ কোটি টাকার অডিট আপত্তি ও অনিয়মের তথ্য পাওয়ার কথা জানানো হলেও অভিযোগ রয়েছে, দালাল ও অসাধু চক্রের দৌরাত্ম্য পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ে সুনির্দিষ্ট দলিল নম্বরসহ একাধিক অভিযোগ জমা পড়লেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার গতি ধীর বলে অভিযোগ রয়েছে।

সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার পরও স্থানীয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা। গণমাধ্যমে দুর্নীতির প্রমাণ ও ভিডিও প্রকাশের পরও নামমাত্র তদন্তের অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিনের হয়রানি ও ভোগান্তি বন্ধে কার্যকর নজরদারির ঘাটতিও রয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।

দুর্নীতি দমন কমিশন এসব অভিযোগের বিষয়ে আগে অভিযান পরিচালনা করলেও দালাল ও অসাধু চক্রের দৌরাত্ম্য পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এ অবস্থায় সাধারণ সেবাগ্রহীতারা অবিলম্বে সিন্ডিকেট ভেঙে গাজীপুরের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলো দালালমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।

ভুক্তভোগী সেবাগ্রহীতাদের দাবি, সিন্ডিকেটের প্রভাব থেকে মানুষকে রক্ষা করতে দলিল নিবন্ধন ও সংশ্লিষ্ট সেবায় ডিজিটাল ফাইলিং চালু, সরকারি ফি ও অন্যান্য খরচের স্বচ্ছ কাঠামো নিশ্চিত এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

অভিযোগের বিষয়ে গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল বাতেনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। একাধিকবার ফোন করা হলে কল কেটে দেওয়া হয়। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রার মোঃ মিজানুর রহমানের সহকারী ফোন রিসিভ করে জানান, স্যার ব্যস্ত আছেন, পরে কল দিয়ে ধরিয়ে দেওয়া হবে। এরপর একাধিকবার ফোন করা হলেও জেলা রেজিস্ট্রারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ, নথি, অডিট আপত্তি এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য যাচাই করে কার্যকর তদন্তের মাধ্যমে অনিয়মের প্রকৃত চিত্র বের করা এবং সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি বন্ধ করাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রত্যাশা।