অপরাধ

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তিন সিপাহীর বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তিন সিপাহীর বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ

শেরপুর প্রতিনিধি:

শেরপুর জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তিন সিপাহীর বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও মাদক কারবারিদের কাছ থেকে মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে ডোপ টেস্ট হয়েছে কি না এবং হয়ে থাকলে ফলাফল কী—তা নিয়ে তৈরি হয়েছে রহস্য। এক সিপাহী প্রথমে ডোপ টেস্ট হয়েছে এবং ফল নেগেটিভ এসেছে বলে জানালেও প্রায় এক সপ্তাহ পর একই বিষয়ে তিনি পরীক্ষা না করার কথা জানিয়েছেন। অপর দুই সিপাহীও ডোপ টেস্টের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তবে দপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ডোপ টেস্ট হয়েছিল এবং তিনি পরীক্ষার পজিটিভ ফলাফল দেখেছেন। যদিও ওই পরীক্ষার লিখিত রিপোর্ট এখনো পাওয়া যায়নি।

মাদক নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকারী সংস্থার মাঠপর্যায়ের কর্মীদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে শেরপুরে আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের মাধ্যমে তাদের ব্যবসা পরিচালনায় সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তিন সিপাহীর বিরুদ্ধেই মাদক সেবনের অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে ধোপাঘাট ও কড়ইতলী এলাকার একজন মাদক কারবারি নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেছেন, সিপাহী আনিসুর রহমান ও রাশেদ মাহমুদ তাদের কাছ থেকে প্রতি মাসে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এই অর্থের বিনিময়ে সংশ্লিষ্টদের মাদক ব্যবসায় মাঠপর্যায়ে বাধা না দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

শেরপুরের হরিজন সম্প্রদায়ের এক নেতার কাছ থেকেও মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার অভিযোগ, সম্প্রদায়ের কাজের প্রয়োজনে মদ পান করার বিষয় থাকলেও পল্লিতে চোলাই মদ তৈরির অবৈধ কারবার বন্ধে অভিযান না চালানোর জন্য সংশ্লিষ্ট সিপাহীরা তার কাছ থেকে মাসে ৫০ হাজার টাকা করে নিয়েছেন। তবে এ অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

জেলার আরও কয়েকজন মাদক কারবারির কাছ থেকে পাওয়া তথ্যেও একই ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে। তাদের দাবি, আনিসুর রহমান ও রাশেদ মাহমুদের মাধ্যমে বিভিন্ন মাদক কারবারির কাছ থেকে মাসে ৫০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। এসব অর্থের বিনিময়ে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান না চালানো কিংবা অভিযানের আগাম তথ্য দেওয়ার মতো সুবিধা দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ডোপ টেস্টে মিলছে না বক্তব্য

ডোপ টেস্টের বিষয়ে সিপাহী আনিসুর রহমানের সঙ্গে প্রথম দফায় মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরীক্ষা হয়েছে এবং ফল নেগেটিভ এসেছে বলে জানান। পরীক্ষার রিপোর্টের কপি চাওয়া হলে তিনি পরে তা দেওয়ার কথা জানান। কিন্তু এরপর তিনি আর যোগাযোগ করেননি এবং রিপোর্টের কোনো কপিও সরবরাহ করেননি।

প্রায় এক সপ্তাহ পর একই বিষয়ে আবার যোগাযোগ করা হলে তার বক্তব্যে পরিবর্তন আসে। এবার তিনি জানান, তাকে ডোপ টেস্ট করার কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি এবং তিনি ডোপ টেস্ট করেননি। একই ব্যক্তির কাছ থেকে একই পরীক্ষার বিষয়ে দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অপর দুই অভিযুক্ত সিপাহীর সঙ্গেও মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তারাও ডোপ টেস্ট করার বিষয়টি অস্বীকার করেন। ফলে তিন অভিযুক্তের বক্তব্যেই বর্তমানে ডোপ টেস্টের বিষয়টি নিয়ে অস্বীকৃতি পাওয়া যাচ্ছে।

তবে অভিযুক্তদের বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একজন কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডোপ টেস্ট করা হয়েছিল এবং তিনি পরীক্ষার ফলাফল দেখেছেন। তার দাবি অনুযায়ী, ফলাফল পজিটিভ ছিল। তবে পরীক্ষার রিপোর্টের কপি বর্তমানে তার কাছে নেই। তিনি সেটি সংগ্রহের চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন।

ওই কর্মকর্তার সঙ্গে প্রতিবেদকের কথোপকথনের অডিও রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে। সেখানে ডোপ টেস্ট, ফলাফল এবং বিষয়টি দপ্তরের ভেতরে আলোচিত হওয়ার বিষয়ে তার বক্তব্য রয়েছে। তবে পরীক্ষার মূল রিপোর্ট হাতে না পাওয়া পর্যন্ত পজিটিভ ফলাফলের দাবিটি স্বতন্ত্রভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

বক্তব্য পরিবর্তনে বাড়ছে প্রশ্ন

ডোপ টেস্টের বিষয়ে আনিসুর রহমানের প্রথম ও পরবর্তী বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য পাওয়া গেছে। প্রথমে তিনি পরীক্ষার কথা জানিয়ে নেগেটিভ ফলের কথা বললেও পরে পরীক্ষা না করার দাবি করেছেন। অপর দুই সিপাহীও একই বিষয়ে পরীক্ষা অস্বীকার করায় বিষয়টি নিয়ে আরও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে প্রথম বক্তব্যের পর রিপোর্ট সরবরাহ না করা এবং পরবর্তী সময়ে ডোপ টেস্টই হয়নি বলে দাবি করার বিষয়টি অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তবে অভিযুক্তদের মধ্যে এ বিষয়ে আন্তঃযোগাযোগ বা সমন্বয় হয়েছিল—এমন কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে নেই।

ডোপ টেস্টের মূল রিপোর্ট পাওয়া গেলে পরীক্ষাটি আদৌ হয়েছিল কি না এবং হয়ে থাকলে ফলাফল কী ছিল, তা নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

অভিযোগ নিয়ে দপ্তরেও আলোচনা

সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, অভিযুক্ত সিপাহীদের কর্মকাণ্ড ও মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নিয়ে দপ্তরের ভেতরে আগে থেকেই আলোচনা ছিল। তাদের আচরণ ও কর্মকাণ্ড নিয়ে ঊর্ধ্বতন পর্যায়েও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগের বিষয়ে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্বে) কাওছারুল আলম রনির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিপাহীদের ডোপ টেস্টের বিষয়টি নিশ্চিত করেননি। তবে তাদের মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অভিযোগ দপ্তরে আসার কথা জানিয়েছেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

এদিকে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট সিপাহীদের দায়িত্ব পালনের নথি, অভিযানসংক্রান্ত তথ্য, মাদক কারবারিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং মাসোহারা আদায়ের অভিযোগে সম্ভাব্য আর্থিক লেনদেন তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের বিরুদ্ধেই মাদক সেবন এবং মাদক কারবারিদের কাছ থেকে মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু ব্যক্তিগত অনিয়ম নয়, মাদকবিরোধী সরকারি কার্যক্রমের বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে ডোপ টেস্টের রিপোর্ট সংগ্রহ করে তা যাচাই, অভিযুক্তদের বক্তব্যের অসঙ্গতি খতিয়ে দেখা এবং মাসোহারা আদায়ের অভিযোগের আর্থিক দিক অনুসন্ধান করা জরুরি।

তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অভিযুক্তদের অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অভিযোগ অসত্য হলে অভিযুক্তদেরও দায়মুক্ত করার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এতে মাদক নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হবে।