নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক সেবা পাওয়ার অধিকার মানুষের মৌলিক প্রত্যাশার অংশ। কিন্তু সেই সেবাই যখন ঘুষ, অননুমোদিত অর্থ, হয়রানি ও মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন তা শুধু ব্যক্তির অর্থনৈতিক ক্ষতিই করে না; রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সুশাসনের ভিত্তিকেও দুর্বল করে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘সেবাখাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’-এর ফলাফলে এমনই এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে দেশের বিভিন্ন সেবা খাতে প্রাক্কলিত মোট ঘুষের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। এ অর্থ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেটের ১.৫৮ শতাংশ এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ০.২৩ শতাংশের সমান। ২০২৩ সালের তুলনায় প্রাক্কলিত ঘুষের পরিমাণ বেড়েছে ১৫.৯ শতাংশ।
জরিপের আরও বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, দুর্নীতির অভিজ্ঞতা শুধু কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সেবা নিতে গিয়ে দেশের ৮১.৬ শতাংশ পরিবার অন্তত একটি খাতে দুর্নীতির সম্মুখীন হয়েছে। ঘুষ দিতে হয়েছে ৬৩.৬ শতাংশ পরিবারকে। ২০২৩ সালের তুলনায় দুর্নীতির শিকার পরিবারের হার ১৫.১ শতাংশ এবং ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া পরিবারের হার ২৫.২ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ গড় ঘুষের পরিমাণ কিছুটা কমলেও ঘুষের আওতায় আসা পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে। খানাপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ২০২৩ সালের ৫ হাজার ৬৮০ টাকা থেকে কমে ২০২৫ সালে ৫ হাজার ১২৪ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ৯.৮ শতাংশ কম। কিন্তু সেবাগ্রহীতার পরিসর বেড়ে যাওয়ায় মোট ঘুষের পরিমাণ উল্টো বেড়েছে।
এই বাস্তবতার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি পাসপোর্ট সেবায়। জরিপে পাসপোর্ট সেবা গ্রহণকারীদের ৭৬.৬ শতাংশ ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। ভৌগোলিক বিভাজনে গ্রামাঞ্চলে এ হার ৭৯.১ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৭১.৮ শতাংশ। দুর্নীতির সামগ্রিক অভিজ্ঞতার হারও এ খাতে অত্যন্ত বেশি। টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, পাসপোর্ট সেবায় দুর্নীতির শিকার হওয়ার হার জাতীয় পর্যায়ে ৮৪.৪ শতাংশ; গ্রামাঞ্চলে ৮৭ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৭৯.৪ শতাংশ।
পাসপোর্টের মতো নাগরিকের সরাসরি প্রয়োজনীয় একটি সেবায় এই চিত্রের পেছনে মধ্যস্থতাকারী বা দালালনির্ভরতার বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে এসেছে। জরিপে দেখা যায়, হাইব্রিড বা জটিল সেবা প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর ৯৮.১ শতাংশ ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ৯১.২ শতাংশ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরাসরি ঘুষ গ্রহণে জড়িত থাকার কথা উত্তরদাতারা জানিয়েছেন। তবে এসব তথ্য জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সংগৃহীত; কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অপরাধের প্রমাণ হিসেবে তা বিবেচনা করা যায় না।
ঘুষের এই বোঝা সবার জন্য সমান নয়। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারের পাসপোর্ট সেবা গ্রহণে মোট ব্যয় তাদের মাসিক আয়ের গড়ে ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে, যার ৩৭ শতাংশ শুধু ঘুষ হিসেবে ব্যয় হয়েছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জরিপে ১৩টি পরিবার জানিয়েছে, তারা তাদের বার্ষিক আয়ের চেয়েও বেশি অর্থ ঘুষ হিসেবে দিয়েছে; কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই অর্থ বার্ষিক আয়ের পাঁচ থেকে ছয় গুণ পর্যন্ত হয়েছে।
পাসপোর্টের পরই রয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সেবা। এ খাতে সেবা নেওয়া পরিবারের ৬৩.৫ শতাংশ ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। ভৌগোলিকভাবে গ্রামাঞ্চলে এ হার ৬১.৫ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৬৬.৩ শতাংশ। দুর্নীতির সামগ্রিক অভিজ্ঞতার হার বিআরটিএতে ৭৯.৩ শতাংশ। লাইসেন্স, ফিটনেস সনদ, রুট পারমিটসহ বিভিন্ন সেবার জটিলতা ও মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভরতা এ খাতের দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে জরিপের ফলাফলে প্রতীয়মান হয়।
ঘুষের উচ্চ হারের তালিকায় বিআরটিএর পর রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও কৃষি সেবা—দুই খাতেই ৪৯.৩ শতাংশ পরিবার ঘুষ দেওয়ার কথা জানিয়েছে। ভূমি সেবায় এ হার ৪৭.৬ শতাংশ। বিচারসংশ্লিষ্ট সেবায় ৩৯.৬ শতাংশ, সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষা সেবায় ৩৪.৮ শতাংশ এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় ২৯.৭ শতাংশ পরিবার ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে এ হার ২৭.৭ শতাংশ এবং জাতীয় পরিচয়পত্র সেবায় ২১.৯ শতাংশ।
ঘুষের মোট অর্থের দিক থেকে ভূমি সেবা সবচেয়ে বড় অংশ দখল করেছে। টিআইবির প্রাক্কলন অনুযায়ী, এক বছরে ভূমি সেবায় ৩ হাজার ৮১ কোটি ২০ লাখ টাকা, বিচারসংশ্লিষ্ট সেবায় ২ হাজার ১২ কোটি ৮০ লাখ টাকা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থায় ১ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা এবং পাসপোর্ট সেবায় ১ হাজার ৮৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে। কৃষি সেবায় ৯১৮ কোটি ৯০ লাখ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ৮০৪ কোটি ৪০ লাখ, ব্যাংকিং সেবায় ৬৭১ কোটি ৯০ লাখ এবং বিআরটিএ সেবায় ৬০৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের প্রাক্কলন করা হয়েছে। শিক্ষা সেবায় ৫২৫ কোটি ৯০ লাখ, বিদ্যুৎ সেবায় ৪৩৫ কোটি ৬০ লাখ এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় ১৮১ কোটি ৭০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের হিসাবও উঠে এসেছে।
একটি পরিবারের ওপর ঘুষের আর্থিক চাপ খাতভেদে ব্যাপকভাবে ভিন্ন। বিচারসংশ্লিষ্ট সেবায় খানাপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ২৪ হাজার ৬৯১ টাকা, ব্যাংকিং সেবায় ১৯ হাজার ৩২২ টাকা এবং ভূমি সেবায় ১১ হাজার ৩১১ টাকা। সার্বিকভাবে খানাপ্রতি গড় ঘুষ ৫ হাজার ১২৪ টাকা। কিন্তু গড় হিসাবটি ঘুষের বৈষম্যমূলক চরিত্রকে পুরোপুরি প্রকাশ করে না। টিআইবির বিশ্লেষণে দেখা যায়, শীর্ষ পাঁচ দুর্নীতিপ্রবণ খাতে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারের বার্ষিক আয়ের ৫.১ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষে ব্যয় হয়েছে, যেখানে দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার ৩.২ শতাংশ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সেবা নিতে গিয়ে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর চাপ আরও স্পষ্ট। এ ধরনের পরিবারগুলো মাসিক আয়ের গড়ে ৩৪ শতাংশ ঘুষ হিসেবে ব্যয় করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই ব্যয় সংশ্লিষ্ট পরিবারের মাসিক আয়ের সাড়ে চার গুণ পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফলে ঘুষ এখানে কেবল অতিরিক্ত ব্যয় নয়; দরিদ্র পরিবারের খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচের ওপরও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
গ্রাম ও শহরের ব্যবধানও জরিপে গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে এসেছে। গ্রামীণ এলাকার ৮৩.৩ শতাংশ পরিবার সেবা নিতে গিয়ে অন্তত একটি খাতে দুর্নীতির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। শহরে এ হার ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ সেবাখাতে দুর্নীতির চাপ শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বেশি। এর সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা, তথ্যপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রভাব এবং মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভরতার মতো বিষয়গুলো সম্পর্কিত কি না, তা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
জরিপে দুর্নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অভিযোগ না করার প্রবণতা। দুর্নীতির শিকার পরিবারের ৬১.৩ শতাংশ কোনো অভিযোগ করেনি। এর পেছনে ভয়, অভিযোগ করে প্রতিকার পাওয়ার বিষয়ে অনাস্থা এবং অভিযোগ প্রক্রিয়ার জটিলতার কথা উঠে এসেছে। একই সঙ্গে ৮১.৫ শতাংশ পরিবার মনে করে, ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া কঠিন। অর্থাৎ ঘুষ অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অনৈতিক লেনদেনের পর্যায় ছাড়িয়ে সেবা পাওয়ার একটি অনানুষ্ঠানিক শর্তে পরিণত হওয়ার অভিজ্ঞতা তৈরি করছে।
ত্রাণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ সহায়তার মতো মানবিক প্রয়োজনের ক্ষেত্রেও দুর্নীতির অভিজ্ঞতা জরিপে ধরা পড়েছে। এ খাতে ঘুষ দেওয়ার হার ১২.৫ শতাংশ এবং প্রাক্কলিত ঘুষের পরিমাণ ১৭ কোটি ১০ লাখ টাকা। দুর্যোগের সময় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার যখন খাদ্য, অর্থ বা অন্যান্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকে, তখন অননুমোদিত অর্থের দাবি তাদের দুর্বল অবস্থাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঘটনা, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সেবাখাতে ঘুষের অর্থনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি রয়েছে সামাজিক প্রভাব। মানুষ যখন আইনসম্মত ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সেবা পাওয়ার বদলে অতিরিক্ত অর্থ প্রদানকে প্রয়োজনীয় মনে করতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা দুর্বল হয়। একই সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম ব্যক্তি দ্রুত বা বিকল্প পথে সেবা পাওয়ার সুযোগ পেলেও দরিদ্র মানুষকে অপেক্ষা, হয়রানি বা অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়। ফলে দুর্নীতি বৈষম্যকে আরও তীব্র করতে পারে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানও সেবাখাতের দুর্নীতিকে বৈষম্যমূলক হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানের পর বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত নতুন বাংলাদেশের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
জরিপটির পরিধিও ছিল বিস্তৃত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর নমুনা কাঠামো ব্যবহার করে দেশের আট বিভাগের গ্রাম ও শহরাঞ্চল থেকে ১ হাজার ১৪৯টি এলাকা নির্বাচন করা হয়। দুই ধাপের স্তরায়িত গুচ্ছ নমুনা পদ্ধতিতে ১৫ হাজার ৭১৫টি পরিবারের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয় ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর। তবে জরিপে যে দুর্নীতির অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা হয়েছে, তার সময়কাল ছিল ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর। টিআইবি জানিয়েছে, এ জরিপ কোনো ধারণা বা মতামতনির্ভর জরিপ নয়; সেবা গ্রহণকারী পরিবারের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সেবাখাতের দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
টিআইবির জাতীয় খানা জরিপ দুর্নীতির একটি পরিসংখ্যানভিত্তিক চিত্র তুলে ধরলেও এর প্রতিটি তথ্যকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি সেবাগ্রহীতাদের অভিজ্ঞতার একটি জাতীয় চিত্র। সেই চিত্রের গুরুত্ব এখানেই যে, একক কোনো ঘটনা নয়, বরং বিভিন্ন সেবা খাতে একই ধরনের অভিজ্ঞতা বারবার উঠে এসেছে। ফলে সমস্যাটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক না হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সেবা প্রক্রিয়া ও জবাবদিহির সঙ্গে কতটা সম্পর্কিত, তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
টিআইবি সেবাখাতে দুর্নীতি কমাতে ১০টি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে সেবা প্রক্রিয়ার আরও কার্যকর ডিজিটালাইজেশন, মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা কমানো, অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত পরিবীক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কিছু খাতে ডিজিটাল সেবা চালু হলেও শুধু প্রযুক্তি যুক্ত করলেই দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না; সেবা প্রক্রিয়ার জটিলতা, মানবিক হস্তক্ষেপ এবং মধ্যস্থতাকারীর সুযোগ থাকলে অনিয়মের ঝুঁকি থেকে যায়।
এখানেই রাষ্ট্রের সামনে মূল প্রশ্নটি দাঁড়ায়—সেবা ডিজিটাল হচ্ছে, কিন্তু সেবা নিতে ঘুষের প্রয়োজন কেন কমছে না? অনলাইনে আবেদন করার পরও যদি নাগরিককে কোনো কার্যালয়ে গিয়ে মধ্যস্থতাকারীর সহায়তা নিতে হয়, নির্ধারিত সময়ের বাইরে কাজ এগিয়ে নিতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয় কিংবা অভিযোগ করেও প্রতিকার না মেলে, তাহলে ডিজিটালাইজেশনের সুফল সীমিত হয়ে পড়ে। তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রক্রিয়ার সরলীকরণ, সেবার নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ের প্রকাশ্য তথ্য, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহি এবং কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থার সমন্বয় জরুরি।
ঘুষের এই অদৃশ্য কর সবচেয়ে বেশি চাপ সৃষ্টি করে সেই মানুষের ওপর, যার হাতে বিকল্প কম। একজন কৃষকের কৃষি উপকরণ, একজন শ্রমিকের পাসপোর্ট, একজন পরিবহনকর্মীর লাইসেন্স বা ফিটনেস সনদ, ভূমির মালিকানাসংক্রান্ত সেবা কিংবা দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সহায়তা—এসব কোনো বিলাসী সুবিধা নয়; নাগরিক জীবনের প্রয়োজনীয় সেবা। এসব সেবায় অননুমোদিত অর্থের চাপ তৈরি হলে নাগরিকের অধিকারই পরোক্ষভাবে ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।
তাই ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকার হিসাবটি শুধু একটি আর্থিক পরিসংখ্যান নয়। এটি রাষ্ট্রীয় সেবা ব্যবস্থার ওপর নাগরিকের অভিজ্ঞতার একটি বড় সতর্কসংকেত। দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে জরিপের তথ্যের পাশাপাশি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জবাবদিহি, অভিযোগের নিষ্পত্তি, সেবা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। রাষ্ট্র যদি সেবা পাওয়ার অধিকারকে বাস্তবে নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে ঘুষের সংস্কৃতি ভাঙার পথও তৈরি হবে। আর তা না হলে উন্নয়নের অর্থনৈতিক অর্জনের পাশাপাশি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে বৈষম্য ও অবিশ্বাসের বোঝা আরও বাড়তে পারে।