আইন ও আদালত

কাস্টমস-রপ্তানি জালিয়াতিতে মামলার জট

কাস্টমস-রপ্তানি জালিয়াতিতে মামলার জট

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

রপ্তানি বাড়াতে সরকার যে নগদ প্রণোদনা ও শুল্কসুবিধা দিয়ে আসছে, তার একটি অংশ জাল কাগজপত্র, ভুয়া রপ্তানি চালান ও শুল্কমুক্ত কাঁচামাল অপব্যবহারের মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। চট্টগ্রাম কাস্টমসের সাম্প্রতিক তদন্তে খাদ্য ও কৃষিপণ্য বাস্তবে রপ্তানি না করেই সরকারি প্রণোদনা নেওয়ার অভিযোগে একটি প্রতিষ্ঠানের দুই মালিকের বিরুদ্ধে চারটি মামলা হয়েছে। একই ঘটনায় পাঁচটি ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) প্রতিষ্ঠান ও তিনটি শিপিং এজেন্টের প্রতিনিধির নামও মামলায় এসেছে। কাস্টমসের তদন্তে মাঠপর্যায়ের ২৮ কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।

ঘটনাটি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫ প্রকাশের পর। ২৫ জুন প্রকাশিত ওই জরিপে কর ও শুল্ক সেবায় ১১ দশমিক ২ শতাংশ পরিবারের দুর্নীতির অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে। ২০২৩ সালের ১৭ দশমিক ৯ শতাংশের তুলনায় এ হার ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। তবে কাস্টমস ব্যবস্থায় বড় অঙ্কের রাজস্ব ও সরকারি প্রণোদনা জড়িত থাকায় সেবাগ্রহীতার অভিজ্ঞতার বাইরে সংঘটিত জালিয়াতি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। টিআইবির জরিপে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার অন্তত একটি সেবা খাতে দুর্নীতির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের তদন্তে যে ঘটনাটি সামনে এসেছে, তার শুরু ২০১৯ ও ২০২০ সালের রপ্তানি নথি থেকে। তদন্ত অনুযায়ী, ডিওই ইমপেক্স লিমিটেডের ৩০টি চালানে বাস্তবে কোনো পণ্য রপ্তানি হয়নি। এরপরও ২৯টি চালানের বিপরীতে প্রায় ১৯ লাখ ৯ হাজার মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় হিসেবে ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আনা হয়। এসব চালানের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি অগ্রণী ব্যাংক থেকে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা সরকারি প্রণোদনা নিয়েছে বলে কাস্টমসের তদন্তে উঠে এসেছে।

কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ভুয়া রপ্তানির নথিতে ছয়টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপো ব্যবহার করা হয়েছিল। পণ্য রপ্তানি না হলেও কনটেইনারে পণ্য বোঝাই এবং তা বন্দর দিয়ে পাঠানোর মতো নথিপত্র তৈরি করা হয়। এ কারণে ঘটনাটির সঙ্গে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সিঅ্যান্ডএফ ও শিপিং এজেন্টদের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আসে। প্রথম দফায় চট্টগ্রামের বন্দর, পতেঙ্গা, পাহাড়তলী ও সীতাকুণ্ড থানায় চারটি মামলা করা হয়েছে।

মামলাগুলোতে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের দুই মালিকের পাশাপাশি পাঁচটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং তিনটি শিপিং বা ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের আসামি করা হয়েছে। তদন্তকারীরা কাস্টমসের মাঠপর্যায়ের ২৮ কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েছেন বলে কাস্টমস কমিশনার জানিয়েছেন। কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা যাচাই শেষে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। তবে কোনো কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ীকে অভিযোগের ভিত্তিতেই দোষী সাব্যস্ত করার সুযোগ নেই; তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াতেই দায় নির্ধারিত হবে।

এই একটি প্রতিষ্ঠানের তদন্তেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ নয়। কাস্টমসের অনুসন্ধানে ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১৮টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য বা খাদ্যপণ্যের ভুয়া রপ্তানির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ৮৪২টি রপ্তানি চালান নিয়ে তদন্ত চলছিল। চালানগুলোর ঘোষিত মূল্য ছিল প্রায় ৪ কোটি ১৯ লাখ মার্কিন ডলার। সংশ্লিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ নগদ সহায়তার নিয়ম বিবেচনায় নিলে সম্ভাব্য প্রণোদনা আত্মসাতের পরিমাণ প্রায় ৭২ কোটি টাকা হতে পারে বলে কাস্টমস প্রাথমিক হিসাবে জানিয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নিশ্চিত নয়।

ভুয়া রপ্তানির এই পদ্ধতিতে কাগজে-কলমে পণ্য রপ্তানি দেখানো হলেও বাস্তবে তা বন্দর বা ডিপোতে না আসার অভিযোগ রয়েছে। নথিপত্রে রপ্তানি সম্পন্ন হয়েছে দেখানোর পর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় রপ্তানি আয় এসেছে বলে তথ্য দেখানো এবং সেই ভিত্তিতে সরকারি প্রণোদনা নেওয়া হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এর ফলে একই ঘটনায় একদিকে সরকারি অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে দেশের প্রকৃত রপ্তানি পরিসংখ্যান ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সরকারের রপ্তানি প্রণোদনা মূলত রপ্তানিকারকদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো এবং নির্দিষ্ট পণ্য ও খাতকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য দেওয়া হয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও বাংলাদেশ ব্যাংক ৪৩টি নির্দিষ্ট রপ্তানি পণ্যের জন্য নগদ প্রণোদনা ও সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। খাতভেদে প্রণোদনার হার শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত রাখা হয়েছে। প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রে রপ্তানি আয় নির্ধারিত সময়ে দেশে প্রত্যাবাসন এবং বৈদেশিক মুদ্রা ও নথিপত্র-সংক্রান্ত শর্ত পূরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোকে আবেদন যাচাই করে অর্থ ছাড় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ প্রণোদনা ব্যবস্থায় একাধিক প্রতিষ্ঠানের যাচাইয়ের প্রয়োজন হয়। রপ্তানিকারক, কাস্টমস, ব্যাংক, শিপিং ও সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন পর্যায়ে তথ্য তৈরি ও যাচাই করা হয়। কোথাও নথির সত্যতা যাচাই দুর্বল হলে পুরো ব্যবস্থায় ফাঁক তৈরি হতে পারে। চট্টগ্রাম কাস্টমসের তদন্তে একই ঘটনায় রপ্তানিকারক, মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভূমিকার অভিযোগ সামনে আসায় সেই সমন্বিত যাচাই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ভুয়া রপ্তানির অভিযোগের পাশাপাশি ২০২৬ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের তদন্তে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে। রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বিদেশি ক্রেতার সরবরাহ করা কাঁচামাল নির্দিষ্ট শর্তে শুল্কমুক্তভাবে আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়। তদন্তে স্যানটেক্স নিটওয়্যারসের বিরুদ্ধে চারটি জাল প্রত্যয়নপত্র ব্যবহার করে দুই বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের ৩৩২ টন কাপড় আমদানির অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স বাতিল এবং ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে কাস্টমস।

আরেক প্রতিষ্ঠান ফোকাস অ্যাপারেলস বিডির বিরুদ্ধে আল ইউসরা টেক্সটাইলের নামে জাল সাবকন্ট্রাক্ট চুক্তি ব্যবহার করে প্রায় ১৯ টন আমদানি করা কাপড় কারখানা থেকে বের করে স্থানীয় বাজারে বিক্রির অভিযোগ তদন্তাধীন। ২১ জুলাই সরেজমিন পরিদর্শনে অনিয়ম শনাক্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে কাস্টমস। চট্টগ্রামে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধা নেওয়া ৪০ থেকে ৪২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১টির ক্ষেত্রে অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কমিশনার জানিয়েছেন। এসব ঘটনায় বন্ড লাইসেন্স বাতিল, শুল্ক-কর আদায় এবং ফৌজদারি মামলা করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অনিয়ম ঠেকাতে শুল্কমুক্ত কাঁচামালের মজুত যাচাই, পণ্য কাটার সময় তদারকি এবং কাগজপত্রের সত্যতা যাচাইসহ নতুন করে ১০টি কমপ্লায়েন্স শর্ত আরোপ করা হয়েছে। সন্দেহজনক ক্ষেত্রে কারখানায় সরেজমিন পরিদর্শনের ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া ইউটিলিটি ঘোষণাও যাচাই করা হচ্ছে।

রপ্তানি প্রণোদনা জালিয়াতির পুরোনো ঘটনাগুলোর মধ্যে ডিওই ইমপেক্সের ঘটনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২২ সালে চট্টগ্রাম কাস্টমসের তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রায় ৪ কোটি ২১ লাখ টাকা প্রণোদনা নেওয়ার অভিযোগ উঠে। পরবর্তী অনুসন্ধানে ১৮টি প্রতিষ্ঠানের ৮৭২টি ভুয়া খাদ্যপণ্য রপ্তানি চালানের তথ্য পাওয়া যায় এবং পাঁচ বছরে ৩৩ কোটি টাকার বেশি প্রণোদনা আত্মসাতের অভিযোগ সামনে আসে। এর মধ্যে ১৯১টি আলুর চালান ও ৬৮১টি অন্যান্য খাদ্যপণ্যের চালান ছিল।

এই ধরনের জালিয়াতিতে শুধু সরকারি অর্থের ক্ষতি হয় না। প্রকৃত রপ্তানিকারক যারা নিয়ম মেনে পণ্য রপ্তানি করেন, তারা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন। একই সঙ্গে কৃত্রিমভাবে রপ্তানি আয় দেখানো হলে বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রকৃত চিত্রও বিকৃত হতে পারে। কোনো পণ্য বাস্তবে রপ্তানি না করেই কাগজে রপ্তানি দেখানো হলে তা অর্থপাচার, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্বচ্ছতার প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে। ২০২৩ সালে টিআইবি রপ্তানি-আমদানি বাণিজ্যের আড়ালে ৩৩টি তৈরি পোশাক কারখানা ও বায়িং হাউসের মাধ্যমে অন্তত ৮২১ কোটি টাকা পাচারের তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর গভীর তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি জানিয়েছিল।

টিআইবির জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫-এ কর ও শুল্ক খাতে দুর্নীতির অভিজ্ঞতা আগের তুলনায় কমে ১১ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসার তথ্য একটি ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে। কিন্তু এই পরিসংখ্যানকে কাস্টমস ব্যবস্থায় সব ধরনের অনিয়ম কমে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। কারণ জরিপটি সেবাগ্রহীতা পরিবারের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি; বড় ধরনের বাণিজ্যিক জালিয়াতি, ভুয়া রপ্তানি বা প্রণোদনা আত্মসাতের মতো অপরাধ এই সূচকের সরাসরি মাপকাঠি নয়। টিআইবি নিজেও জানিয়েছে, জরিপটি ১৭টি সেবাখাতে নাগরিকদের সেবা গ্রহণের অভিজ্ঞতা পরিমাপ করেছে।

তবু দুটি চিত্র পাশাপাশি রাখলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়। একদিকে সাধারণ মানুষ কর ও শুল্ক সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিজ্ঞতার কথা বলছেন, অন্যদিকে বাণিজ্যিক পর্যায়ে সরকারি সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে জাল নথি ও ভুয়া রপ্তানির অভিযোগ তদন্তে আসছে। অর্থাৎ কাস্টমস ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা শুধু সেবাগ্রহীতার হয়রানি কমানোর প্রশ্ন নয়; এটি একই সঙ্গে রাজস্ব সুরক্ষা, বৈদেশিক বাণিজ্যের তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং সরকারি প্রণোদনার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়।

প্রণোদনা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে জালিয়াতি বন্ধে শুধু মামলা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। রপ্তানি চালানের তথ্য কাস্টমস, বন্দর, শিপিং এজেন্ট, ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলিয়ে দেখার ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। একই চালান বাস্তবে বন্দরে প্রবেশ করেছে কি না, কনটেইনার কোথায় গেছে, পণ্য জাহাজে উঠেছে কি না, রপ্তানি আয় বাস্তবে দেশে এসেছে কি না এবং প্রণোদনা পাওয়ার যোগ্যতা পূরণ হয়েছে কি না—এসব তথ্য আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা গেলে কাগুজে রপ্তানির সুযোগ কমতে পারে।

সাম্প্রতিক মামলাগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মধ্যস্থতাকারী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা। একটি রপ্তানি চালান সম্পন্ন করতে একাধিক প্রতিষ্ঠানের নথি প্রয়োজন হওয়ায় সমন্বিত জালিয়াতি হলে তা শনাক্ত করতে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব পরীক্ষা যথেষ্ট নয়। চট্টগ্রাম কাস্টমসের তদন্তে একই ঘটনার সঙ্গে রপ্তানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ, শিপিং এজেন্ট এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি তাই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

তবে তদন্তাধীন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, তদন্তের ফলাফল, মামলার অভিযোগপত্র এবং আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত দায় নির্ধারিত হবে। কাস্টমসের বর্তমান পদক্ষেপের ইতিবাচক দিক হলো, শুধু রপ্তানিকারক নয়, সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকার কথাও তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।

রপ্তানি প্রণোদনা বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাতের জন্য একটি নীতিগত সহায়তা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও সরকার এটি অব্যাহত রেখেছে। ফলে এই অর্থ যেন প্রকৃত রপ্তানিকারক ও নির্ধারিত খাতে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ভুয়া রপ্তানির মাধ্যমে প্রণোদনা নেওয়া প্রমাণিত হলে তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নয়; একই সঙ্গে সৎ ব্যবসায়ীদের প্রতি বৈষম্য এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহারের প্রশ্ন তৈরি করে।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের চলমান মামলা ও তদন্ত তাই বৃহত্তর বাণিজ্যিক জবাবদিহির পরীক্ষাও হয়ে উঠেছে। একটি মামলার পর আরেকটি মামলা করার পাশাপাশি কত দ্রুত তদন্ত শেষ হয়, অবৈধভাবে নেওয়া সরকারি অর্থ উদ্ধার করা যায় কি না, জড়িত কর্মকর্তাদের দায় নির্ধারণ করা যায় কি না এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের জালিয়াতির পথ বন্ধ করা যায় কি না, সেটিই হবে মূল বিষয়।

টিআইবির জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫-এর আলোকে কাস্টমস ও কর ব্যবস্থায় দুর্নীতি কমার যে পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে, সেটিকে ধরে রাখতে হলে বড় বাণিজ্যিক জালিয়াতির বিরুদ্ধেও কঠোর ও প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। কারণ সেবা খাতে দুর্নীতি কমানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা ও শুল্কসুবিধার অপব্যবহার বন্ধ না হলে সরকারি অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে না। কাস্টমসের চলমান মামলাগুলো সেই জায়গাতেই নতুন করে নজর কাড়ছে।