অপরাধ

সিলেটে শিক্ষা খাতে মামলা, স্থানীয় সরকার প্রকল্পেও দুদকের নজর

সিলেটে শিক্ষা খাতে মামলা, স্থানীয় সরকার প্রকল্পেও দুদকের নজর

নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট

সিলেটে শিক্ষা ও স্থানীয় সরকার খাতে নিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্প এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একদিকে জনবল নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা ও কারাগারে যাওয়ার ঘটনা রয়েছে, অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের তৎপরতা দেখা গেছে।

সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে জনবল নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে করা মামলাটি শিক্ষা খাতে নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে। দুদকের মামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় কর্মকর্তাকে আসামি করা হয় এবং মামলার ধারাবাহিকতায় তাঁদের কারাগারে পাঠানোর খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে মামলায় অভিযোগ আনা বা আসামি হওয়া অপরাধের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য, নথি ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতেই দায় নির্ধারিত হবে।

নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের গুরুত্ব শুধু সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা বা একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তি, যোগ্যতা যাচাই, লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা, মেধাক্রম, নিয়োগ বোর্ডের সিদ্ধান্ত এবং অনুমোদনের প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছ না হলে যোগ্য প্রার্থী বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সক্ষমতা ও শিক্ষার মানের ওপরও।

সিলেটের স্থানীয় সরকার খাতেও উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকল্পে দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদক নথিপত্র সংগ্রহ ও অভিযান পরিচালনা করেছে। একটি অভিযানে এলজিইডির অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের নথি সংগ্রহের পাশাপাশি অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আত্তীকরণে অনিয়মের অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট রেকর্ডও নেওয়া হয়। প্রাথমিক পর্যালোচনায় প্রকল্পে অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা রয়েছে বলে দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন।

স্থানীয় সরকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কাজের বিপরীতে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার। প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয়, দরপত্র, ঠিকাদার নির্বাচন, কাজের পরিমাণ, নির্মাণমান, বিল পরিশোধ এবং বাস্তব অগ্রগতির মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে সরকারি অর্থের অপচয় বা আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে কোনো প্রকল্পে এ ধরনের অনিয়ম ঘটেছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য প্রকল্পের নথি ও মাঠপর্যায়ের কাজ যাচাই করা প্রয়োজন।

সিলেট জেলা পরিষদের বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমও স্থানীয় সরকার খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনার আলোচনায় রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সিলেট জেলার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় জেলা পরিষদ উন্নয়ন সহায়তা খাতে বিশেষ বরাদ্দ থেকে অর্থ অবমুক্তির সরকারি আদেশ রয়েছে। একই সময়ে জেলা পরিষদের মালিকানাধীন ভূমিতে বাস্তবায়নাধীন ‘জেলা পরিষদ ন্যাচারাল পার্ক উন্নয়ন’ প্রকল্পের কাজের সময়সীমা বাড়ানোর সরকারি আদেশও দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের সময় বাড়ানো নিজেই অনিয়মের প্রমাণ নয়; তবে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় কেন পরিবর্তিত হচ্ছে, কাজের অগ্রগতি কতটা এবং বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন।

সিলেটের শিক্ষা খাতে নিয়োগ এবং স্থানীয় সরকার খাতে প্রকল্প—দুই ক্ষেত্রের অভিযোগের মধ্যে একটি সাধারণ জায়গা রয়েছে। সেটি হলো সরকারি প্রতিষ্ঠানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অর্থ ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি। নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতার বদলে প্রভাব বা অনিয়ম কাজ করলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইভাবে উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম হলে জনগণের জন্য নির্ধারিত অবকাঠামো ও সেবা প্রত্যাশিত মানে পৌঁছায় না।

জাতীয় পর্যায়েও সরকারি সেবা ও বিভিন্ন খাতে দুর্নীতির বিস্তৃত চিত্র নিয়ে আলোচনা চলছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫ সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিজ্ঞতা ও ঘুষের ব্যাপকতার বিষয়টি সামনে এনেছে। সেই প্রেক্ষাপটে সিলেটের স্থানীয় পর্যায়ে নিয়োগ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোও শুধু বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কমে এসেছে।

তবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশের ক্ষেত্রে অভিযোগ, তদন্ত ও প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি। দুদকের মামলা, অনুসন্ধান বা অভিযানকে অপরাধের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা আইনগতভাবে সঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদার বা নিয়োগপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত অন্য পক্ষগুলোর বক্তব্যও তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সিলেটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থেকে চূড়ান্ত ফল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ নথিভুক্ত ও যাচাইযোগ্য করা, মেধাক্রম প্রকাশ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। একইভাবে স্থানীয় সরকার প্রকল্পে দরপত্র, বরাদ্দ, কাজের অগ্রগতি, ব্যয় ও বিল পরিশোধের তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ এবং নিয়মিত সরেজমিন পরিদর্শন জোরদার করা দরকার।

কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটি অনিয়মিত নিয়োগ যেমন দীর্ঘদিনের জন্য প্রতিষ্ঠানের প্রশাসন ও শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করতে পারে, তেমনি একটি অনিয়মিত প্রকল্প সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত করতে পারে। তাই সিলেটে নিয়োগ ও প্রকল্প-সংক্রান্ত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের অভিযোগ প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সিলেটের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো শেষ পর্যন্ত একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনছে—সরকারি প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থ এবং নিয়োগের সুযোগ কতটা স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হচ্ছে। দুদকের তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া সেই প্রশ্নের আইনি উত্তর দেবে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হবে এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যাতে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি শুরুতেই অনিয়মের সুযোগ কমে আসে।