অপরাধ

১২% ঘুষ দিতে অস্বীকার করায় ঠিকাদারকে মারধর করে হাত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ

১২% ঘুষ দিতে অস্বীকার করায় ঠিকাদারকে মারধর করে হাত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ

ফরিদপুর প্রতিনিধি

ফরিদপুরের নগরকান্দায় উন্নয়ন প্রকল্পের বিল ছাড়ের বিনিময়ে ঘুষ দাবির অভিযোগ এবং ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় এক ঠিকাদারকে মারধর করে হাত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নগরকান্দা পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা হুমায়ূন কবির ও তাঁর সহযোগী মোসলেম উদ্দিনের বিরুদ্ধে। বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে নগরকান্দা পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তার কক্ষে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেছেন ঠিকাদার হাসিবুল হাসান আব্দুল্লাহ। বিষয়টি নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পাওয়া গেছে এবং প্রশাসন তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

ঠিকাদার হাসিবুল হাসান আব্দুল্লাহর অভিযোগ, তাঁর প্রতিষ্ঠান সৈয়দা জাহানারা এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে ২০২৩ সালে আইইউআইডিপি প্রকল্পের আওতায় নগরকান্দায় তিনটি সড়কের আরসিসি ঢালাইয়ের কাজ করা হয়। ওই কাজের বিল প্রায় আট মাস আগে অনুমোদন হলেও তা আটকে রাখা হয়েছে বলে দাবি তাঁর। বিল ছাড়ের জন্য পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রথমে মোট বিলের ১৫ শতাংশ ঘুষ দাবি করেন এবং আপত্তির পর তা ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

হাসিবুলের দাবি, গত ১০ আগস্ট তিনি ৫ লাখ টাকা দিয়েছেন। এরপর আরও ৭ লাখ টাকা দাবি করে বিল আটকে রেখে তাঁকে হয়রানি করা হচ্ছিল। এ অবস্থায় বুধবার দুপুরে প্রশাসনিক কর্মকর্তার কক্ষে গেলে তাঁকে মারধর করা হয় এবং তাঁর হাতে আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে তাঁকে নগরকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

নগরকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এস এম ইফতেখার আজাদ জানান, মারামারিতে আহত একজন রোগী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসেছিলেন। তাঁর হাতে নীলাফোলা জখম ও আঘাতের চিহ্ন ছিল। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাত ভাঙার বিষয়ে এক্স-রে করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং তিনি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ঘুষ দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নগরকান্দা পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা হুমায়ূন কবির। তাঁর বক্তব্য, ঠিকাদারের কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় বিল দেওয়া হচ্ছিল না। কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বিল না দিতে পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশনা ছিল বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর আরও দাবি, এ কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে ঠিকাদার প্রথমে তাঁদের কক্ষে এসে হামলা করেন। তবে ঠিকাদারকে মারধর কিংবা জিআই পাইপ দিয়ে তাঁর হাত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।

নগরকান্দা পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা আফরিন বলেন, ঠিকাদারের বিলের বিষয়টি তিনি অবগত। কাজের অসংগতি পাওয়ায় কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বিল দিতে নিষেধ করা হয়েছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তার কক্ষে ঠিকাদার কী কারণে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন। সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এ ধরনের ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

নগরকান্দা পৌরসভার সরকারি কাঠামোয় প্রশাসন ও হিসাব বিভাগের পাশাপাশি প্রকৌশল বিভাগও রয়েছে। ফলে কোনো উন্নয়নকাজের বিল নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে কাজের বাস্তব অগ্রগতি, অনুমোদন, বিল প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি তথ্য বাতায়নে নগরকান্দা পৌরসভার প্রশাসন ও প্রকৌশল বিভাগের কার্যক্রমের তথ্যও রয়েছে।

এ ঘটনায় ঘুষ দাবির অভিযোগ, বিল আটকে রাখার কারণ, ঠিকাদারের কাজের মান ও পরিমাণ এবং মারধরের অভিযোগ—সবকিছুই পৃথকভাবে তদন্তের মাধ্যমে যাচাই প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করে উভয় পক্ষের বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করাই হবে বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনের মূল ভিত্তি। তদন্তের ফল এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি প্রকাশ্যে এলে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণে আরও স্পষ্টতা আসতে পারে।