ভিপি-জিএসের দাবি, ইশতেহারের বেশিরভাগ কাজ সম্পন্ন; পরিবহন, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোসহ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের অপেক্ষায়
নিজস্ব প্রতিবেদক :
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) এক বছর মেয়াদ পূর্তি উপলক্ষে নিজেদের কার্যক্রম ও জবাবদিহি প্রতিবেদন তুলে ধরেছেন নির্বাচিত নেতারা। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ডাকসু ভবনের সামনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সহসভাপতি (ভিপি) আবু সাদিক কায়েম কার্যক্রমের বিস্তারিত তুলে ধরেন। এ সময় তিনি ইশতেহার অনুযায়ী বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করার দাবি করেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারের অসহযোগিতায় বেশ কিছু উদ্যোগ আটকে আছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদও প্রতিবেদনের বিভিন্ন অংশ তুলে ধরেন। এ সময় ডাকসুর অন্যান্য নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
সাদিক কায়েম বলেন, দায়িত্ব পালনকালে ডাকসু পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও সেবার পরিসর বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। পাঁচটি নতুন হল ও ১০টি ভবন নির্মাণ, শাটল চালু, মেডিকেল সেন্টার এবং সেন্ট্রাল মসজিদের আধুনিকায়নের মতো কার্যক্রম করা হয়েছে।
উচ্চশিক্ষা ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের পাশাপাশি ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের মতো কর্মসূচিও চালানো হয়েছে বলে জানান তিনি। তার দাবি, এক বছরে ৪০০-এর বেশি শিক্ষার্থীকে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন হলে ছারপোকা ও মশক নিধন এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির পাশাপাশি হল সংস্কারের বাজেটও আদায় করা হয়েছে।
১৩টি হলের রিডিংরুমে এসি স্থাপন ও আধুনিকায়নের কথা জানিয়ে ডাকসু ভিপি বলেন, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে ডাকসু নির্বাচনকে অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারের অংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটি এখন বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।
এ ছাড়া মাতৃত্বকালীন ছুটি, ডে-কেয়ার ও জিমনেসিয়াম স্থাপন, ব্রেস্টফিডিং রুম ও ডে-কেয়ারের জন্য বাজেট আনা এবং ছাত্রী হলের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি।
যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধ
যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন ডাকসু নেতারা। সাদিক কায়েম বলেন, সরকারি পদক্ষেপ ও সামাজিক প্রতিরোধের পরিবেশ তৈরির জন্য ডিএমপি কমিশনারের কাছে করণীয় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগী শতাধিক শিক্ষার্থীকে সরাসরি আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং কমিটি গঠনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কমনরুম আধুনিকায়ন, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা এবং সহযোগিতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রমের কথাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি মেডিকেল সেন্টার আধুনিকায়ন ও মানসিক স্বাস্থ্যসহ স্বাস্থ্যসেবায় ডাকসুর নেওয়া বিভিন্ন কার্যক্রমের বিস্তারিত জানানো হয়।
বিষয়ভিত্তিক সাহিত্য, সাময়িকী ও বই প্রকাশের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে চলাচলকারী বিভিন্ন বাহনের চালকদের তালিকা, পোশাক ও ভাড়ার চার্ট তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তারা। আটটি গেটে ট্রাফিক সহায়তার জন্য ডিএমপির সঙ্গে সমন্বয়ের প্রস্তাব করা হলেও সরকার পরিবর্তনের পর প্রকল্পটি স্থগিত রয়েছে বলে দাবি করেন ডাকসু নেতারা।
সুফিয়া কামাল হলের ঝুঁকিপূর্ণ ফুটওভার ব্রিজ ও একটি যাত্রীছাউনি অপসারণ, অন্য একটি সংস্কার এবং বহিরাগত নিয়ন্ত্রিত ক্যাম্পাস বাস্তবায়নের চেষ্টার কথাও তুলে ধরা হয়।
শিক্ষক মূল্যায়ন ও শিক্ষার্থীদের সেবা
শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্রের আধুনিকায়ন ও ক্রীড়া ইভেন্ট আয়োজনের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করা এবং ক্যাফেটেরিয়া ও ক্যান্টিনের মান উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান ডাকসু নেতারা।
টিএসসিতে স্বল্পমূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করা গেলেও স্বল্পমূল্যে টিসিবির পণ্য বিক্রিসহ কয়েকটি উদ্যোগ এখনো আটকে আছে বা বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে বলে তারা জানান।
শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর বিষয়ে ডাকসু নেতারা বলেন, এসএমটি ও অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে পাস হওয়ার পর বিষয়টি সিন্ডিকেটে উত্থাপন করা হয়েছে। তবে নিয়মিত দাবি জানানো হলেও প্রশাসনের গড়িমসিতে তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা। প্রশাসনের অপেক্ষা না করে শিক্ষার্থীদের স্বার্থে ডাকসুর নিজস্ব উদ্যোগে একটি সাইট চালু করা হয়েছে বলেও জানান তারা।
রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের সেবা সহজীকরণ, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি সম্প্রসারণ, বিভিন্ন লাইব্রেরিতে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং অ্যালামনাইদের বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রমে যুক্ত করার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরা হয়।
এ ছাড়া মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয় সংস্কার, মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি প্রদান এবং ফার্স্ট এইড বুট ক্যাম্পের মাধ্যমে হলের সিকবয় ও কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা জানান ডাকসু নেতারা।
যেসব উদ্যোগ আটকে থাকার অভিযোগ
ডাকসু নেতাদের দাবি, সব হলে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন, এআই ও প্রোগ্রামিং প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ, সার্টিফিকেশন সহায়তা, ইনোভেশন হাব এবং জব ফেয়ারসহ বেশ কিছু উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
তাদের ভাষ্য, মাঠ সংস্কার প্রকল্প ও ডিজিটাল সার্ভের কাজও নানা অজুহাতে বন্ধ রাখা হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ ও ডিএসসিসির পাঁচটি প্রকল্প—এ এফ রহমান হলের প্রবেশদ্বার, ডাকসু ক্যাফেটেরিয়া সংস্কার, পুকুরপাড় বাঁধাই, ওয়াকওয়ে, লাইটিং ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজও আটকে রয়েছে।
এ ছাড়া রেজিস্টার্ড রিকশা চালু, পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ এবং পুরোনো যানবাহন নিলামে দিয়ে দুটি মিনিবাস ও দুটি মাইক্রোবাস কেনার উদ্যোগ অনুমোদনের পরও বাস্তবায়ন হয়নি বলে দাবি করেন তারা।
ডাকসু নেতারা আরও বলেন, পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণ, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রিন ক্যাম্পাস নিশ্চিতে ডাস্টবিন স্থাপনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কার্যক্রম
জুলাই বিপ্লবের বার্ষিকী উপলক্ষে ডাকসুর আয়োজিত অনুষ্ঠানমালা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ইস্যুতে অবস্থান, হল সংসদ ও সামাজিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম সমন্বয় এবং জাতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ দিবস উদ্যাপনের কথাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ডাকসুর সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়ের কথাও জানান নেতারা। মসজিদসহ ধর্মীয় স্থাপনা সংস্কার, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা সংস্কারে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়।
সিনেট অধিবেশনে ডাকসুর প্রতিনিধিত্বের কথা জানিয়ে নেতারা বলেন, বিভিন্ন স্থাপনা থেকে ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম না সরানোর প্রতিবাদে ডাকসু নেতারা সিনেট অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন।
তাদের দাবি, এক বছরে দুবার ডাকসুর সব সদস্য ও সব হল সংসদের সদস্যরা একসঙ্গে বসে নিজেদের কাজের বিবরণ দিয়েছেন। ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থাকলেও একটি দিনের জন্যও ক্লাস বা পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়নি বলেও তারা জানান। একই সময়ে ডাকসু ভবনের সংস্কারকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে বলে দাবি করেন নেতারা।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বাধার কারণে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ডাকসুর নেওয়া কিছু উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ করেন ভিপি-জিএস।
সারাদেশ