ভূমিকম্প, বন্যা, তাপপ্রবাহ ও উপকূল বিপর্যয়ে বাড়ছে শঙ্কা
এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ হবে আরও ভয়াবহ: বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
জিএম রফিক:
বাংলাদেশ আজ এক বহুমাত্রিক জলবায়ু সংকটের মুখোমুখি। একদিকে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, বন্যা ও খরা—অন্যদিকে ভূমিকম্পের মতো নতুন আতঙ্কও বাড়ছে মানুষের উদ্বেগ। পরিবেশবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা ও পরিবেশ ধ্বংসের ধারাবাহিক প্রভাব পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশেও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি ভূমিকম্প সৃষ্টি না করলেও, পৃথিবীর ভূত্বকে চাপের পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, হিমবাহ গলা এবং অতিরিক্ত নগরায়নের কারণে ভূ-প্রাকৃতিক ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশ এখন শুধু জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ নয়, বরং বহুমাত্রিক দুর্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতেও পরিণত হচ্ছে।
উষ্ণ হচ্ছে পৃথিবী, বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ:
গত এক দশকে বাংলাদেশে গড় তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রীষ্ম দীর্ঘ হচ্ছে, শীত কমে যাচ্ছে, বর্ষা অনিয়মিত হয়ে উঠছে। রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে তাপদাহ এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা।
উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে লবণাক্ততা বাড়ছে। সুন্দরবন হুমকির মুখে। নদীভাঙনে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হচ্ছে। কৃষি উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
প্রখ্যাত পরিবেশবিদ ও জীববিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. একেএম মাহবুব হাসান মতে, শিল্পকারখানার দূষণ, বন উজাড়, প্লাস্টিক ব্যবহার, জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং উন্নত বিশ্বের কার্বন নিঃসরণ পৃথিবীকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম, যদিও বৈশ্বিক দূষণে বাংলাদেশের অবদান অত্যন্ত কম।
ভূমিকম্প আতঙ্ক: নতুন বাস্তবতা :
সম্প্রতি বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে একাধিক ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। ভূতত্ত্ববিদরা বলছেন, বাংলাদেশ ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগ অঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের একাধিক গবেষক মনে করেন, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও দুর্বল অবকাঠামো বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে ব্যাপক প্রাণহানির কারণ হতে পারে।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস ছামাদ এর মতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখন পৃথিবীর বিভিন্ন ভূ-প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াতেও চাপ তৈরি হয়। ফলে দুর্যোগের প্রকৃতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত: “এখনই ব্যবস্থা না নিলে দেরি হয়ে যাবে”
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সরকার নয়—সচেতন হতে হবে পুরো বিশ্বকে। উন্নত দেশগুলোকে কার্বন নিঃসরণ কমাতে বাধ্য করতে হবে এবং জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
পরিবেশবিদদের সুপারিশগুলো হলো নির্বিচারে বন উজাড় বন্ধ করতে হবে, নদী ও জলাশয় দখলমুক্ত করতে হবে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে, পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা করতে হবে, ভূমিকম্প সহনশীল ভবন নির্মাণ বাধ্যতামূলক করতে হবে, উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই বাঁধ ও আশ্রয়কেন্দ্র বাড়াতে হবে, স্কুল-কলেজে জলবায়ু শিক্ষা চালু করতে হবে, দুর্যোগ পূর্বাভাস ও উদ্ধার সক্ষমতা আধুনিক করতে হবে ।
বাংলাদেশের কী করা উচিত:
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় জলবায়ু নিরাপত্তা পরিকল্পনা। শুধু কাগুজে প্রকল্প নয়, বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে।
সম্ভাব্য করণীয়:
প্রথমত: জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর জন্য আলাদা মাস্টারপ্ল্যান
দ্বিতীয়ত: উপকূল অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বনায়ন বৃদ্ধি
তৃতীয়ত: ঢাকাসহ বড় শহরে সবুজ অঞ্চল বাড়ানো
চতুর্থত: দুর্যোগ সহনশীল আবাসন প্রকল্প
পঞ্চমত: গবেষণাভিত্তিক পরিবেশ নীতি
ষষ্টত: আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল আদায়ে আরও জোরালো কূটনৈতিক ভূমিকা
সপ্তমত: কার্বন নির্গমন কমাতে শিল্পখাতে কঠোর নজরদারি করা এ ছাড়া সাধারণ মানুষের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে। প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, গাছ লাগানো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অপচয় কমানো এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন এখন সময়ের দাবি।
ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নিরাপদ কি
জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান গতি অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশের উপকূলীয় বড় অংশ পানির নিচে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গবেষণায় একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খাদ্য সংকট, পানির সংকট ও পরিবেশ উদ্বাস্তু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, “জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের সমস্যা নয়, এটি এখনকার বাস্তবতা। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য বাংলাদেশ রেখে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।