চট্টগ্রাম প্রতিবেদক:
বাংলাদেশে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়াসহ অন্তত অর্ধশতাধিক গ্রামে আগামীকাল বুধবার পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করবেন মির্জাখীল দরবার শরীফের অনুসারীরা। প্রতিবছরের মতো এবারও সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে একদিন আগে ঈদুল আজহা উদযাপন করবেন তারা।
দক্ষিণ চট্টগ্রামে এটি বহুদিনের পরিচিত বাস্তবতা হলেও একই দেশে ভিন্ন দিনে রোজা শুরু হওয়া নিয়ে প্রতিবছরই আলোচনা ও কৌতূহল তৈরি হয়।
মির্জাখীল দরবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় আড়াই শত বছর আগে সাতকানিয়া উপজেলার মির্জাখীল গ্রামের হযরত মাওলানা মোখলেছুর রহমান জাহাঁগীরি (রহ.) হানাফি মাজহাবের আলোকে পৃথিবীর যেকোনো স্থানে চাঁদ দেখা গেলে তা অনুসরণ করে ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা পালনের ফতোয়া প্রদান করেন। সেই ধারাবাহিকতায় দরবারের অনুসারীরা সৌদি আরবসহ আরব বিশ্বের চাঁদ দেখার ঘোষণাকে গুরুত্ব দিয়ে রোজা, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা পালন করে আসছেন।
মির্জাখীল দরবার শরীফের দায়িত্বশীল মুহাম্মদ জালালুল হাই বলেন, ‘আমরা হানাফি মাজহাবের অনুসারী।
আরব বিশ্বের চাঁদ দেখার খবর দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে চাঁদের অবস্থান বিবেচনায় আগামীকাল বুধবার সে অনুযায়ী ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করা হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এটি আমাদের শতবর্ষী ধর্মীয় অনুশাসন। আমরা কারো বিরোধিতা করছি না।’
দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, আনোয়ারা ও পটিয়া উপজেলার অন্তত ৫০টির বেশি গ্রামে লক্ষাধিক মানুষ বুধবার পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করবেন।
উল্লেখযোগ্য গ্রামগুলোর মধ্যে রয়েছে—সাতকানিয়ার মির্জাখীল, সোনাকানিয়া, ছোটহাতিয়া, আছারতলি, লোহাগাড়ার কলাউজান, বড়হাতিয়া, চুনতি; বাঁশখালীর ছনুয়া, চাম্বল, শেখেরখীল; পটিয়ার হাইদগাঁও, বাহুলী, ভেল্লাপাড়া, মোহাম্মদ নগরসহ বিভিন্ন এলাকা। এ ছাড়াও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা এবং ভারত, মিয়ানমার, জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, সুইজারল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত অনুসারীরাও একই নিয়মে ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করবেন।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা নির্ধারণে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্তই রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুসরণ করা হয়। দেশের অধিকাংশ মুসলমান সেই ঘোষণার ভিত্তিতেই ঈদ উদযাপন করেন। তবে স্থানীয়ভাবে কিছু সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে আসছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রামের একজন ইসলামি গবেষক বলেন, চাঁদ দেখার বিষয়ে মাজহাবভেদে মত রয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষিত জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসরণ করলে মুসলিম সমাজে ঐক্য আরো দৃঢ় হয়। একই দেশে একাধিক দিনে ঈদ হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
তবে এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, এটি বহুদিনের চর্চা। আইন-শৃঙ্খলার কোনো সমস্যা না হলে সাধারণত প্রশাসন এতে হস্তক্ষেপ করে না। দীর্ঘদিন ধরে এটি শান্তিপূর্ণভাবেই পালিত হয়ে আসছে।
এদিকে, বিশ্বাস ও বাস্তবতার মাঝে ব্যতিক্রমী রমজান দক্ষিণ চট্টগ্রামে মির্জাখীল দরবার শরীফের অনুসারীদের আগাম ঈদ পালন একদিকে শতবর্ষী ধর্মীয় ঐতিহ্য, অন্যদিকে জাতীয় ঐক্য ও চাঁদ দেখার নীতিমালা নিয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে রয়েছে। রমজান ও ঈদের সময় প্রতিবছরই এই অঞ্চলে এমন ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা যায়।