ঝিনাইদহে খাল খননে লাগামহীন প্রতারণা, অনিয়ম ও দুর্নীতি
ঝিনাইদহ সংবাদদাতা:
কাটা হয়েছে পাড়ের গাছ, নিয়ম ভেঙে খাল পাড়ের ভিতরের অংশে লাগানো হয়েছে গাছের চারা। ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুতে বরাদ্দের খালের পরিবর্তে সংরক্ষিত সেচ খাল খনন, ভাটির পরিবর্তে উজানে বেড়েছে গর্ত। হতদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় খাল খননে নিয়ম বর্হিভূতভাবে কোন প্রকার নকশা অনুসরন না করেই সংরক্ষিত জিকে সেচ প্রকল্পের সেচ খাল খনন করেছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দপ্তর। এ ব্যাপারে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সেচ সুবিধাভোগী কৃষকরা। অভিযোগ সেখানে হতদরিদ্র শ্রমিকের পরিবর্তে স্কেভেটর দিয়ে খনন করা হয়েছে অধিকাংশ মাটি। বিষয়টিতে জেলা প্রশাসনের কাছে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে বলেও জানা গেছে।
পিআইসি’র দায়িত্বে থাকা কাপাশহাটিয়া ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মর্জিনা বেগমের স্বামী শরিফুল ইসলাম খালটি খনন করেন। মোবাইলে তিনি বলেন, 'এ বিষয়ে আমি তেমন কিছুই জানিনা। পিআইও স্যার সব বলতে পারবেন।' তবে কতজন শ্রমিক ছিল, কারাই বা সেই শ্রমিক তার কোন উত্তর দেননি শরিফুল ইসলাম।
অনিয়মের বিষয়ে জানতে হরিণাকুণ্ডু উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আজিজুর রহমান এর দপ্তরে গেলে তিনি বলেন ‘নারে ভাই না, বলছি যে রাখেন। এ কাজ করতে হবে না আপনার। আমি কিছু বলবো না’ বলে চেয়ার থেকে উঠে যান।
ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার দাস বলেন, 'সেচ খাল খননের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ডিজাইন অনুসরণ করা প্রয়োজন। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দপ্তর থেকে কোন ডিজাইন চাওয়া হয়নি, বিষয়টি পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটিতে উপস্থাপন করা হবে।'
জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন বলেন, 'খালটির বিষয়ে কিছু অভিযোগ এসেছে। অভিযোগ এবং খননে অতি দরিদ্রদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কোন অনিয়ম পরিলক্ষিত হলে আবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
বিষয়টি জানতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ওয়েব সাইটে দেওয়া কাবিখা-৩ প্রকল্প এর উপ-পরিচালক নুরুল ইসলাম এর মোবাইল নাম্বারে কল দেওয়া হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
জানা যায়, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থানের লক্ষে বিশেষ অনুদান খাতে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দপ্তরের মাধ্যমে ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলায় ডি-১২এক্স কে (D-12XK) ড্রেনেজ খালের ৪.৯৩ কিলোমিটার(১ কোটি ২৬ লক্ষ ৯৮ হাজার ২৯৮ টাকা ব্যায়ে) ও ১-ডি-১১-এন (1-D-11-N) ড্রেনেজ খালের ১.৩১ কিলোমিটার (৩৩ লক্ষ ৭৭ হাজার ৩৫০ টাকা) ব্যয়ে খননের নির্দেশনা দেওয়া হয়। যেখানে প্রকল্প এলাকায় উপকারভোগী নির্বাচন করে সপ্তাহে ৭ দিন কাজের ব্যবস্থা, পানি নিষ্কাশন, সেচ ব্যবস্থা ও কৃষি উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া সহ রাখা হয় কিছু শর্ত। ড্রেনেজ খাল পানি নিষ্কাশন ও সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার হয়।
কিন্তু ‘ডি-১২এক্স কে’ খালটি খনন করলেও অনুমোদিত ‘১-ডি-১১-এন’ খালটি’র পরিবর্তে অনুমোদনহীন পানি উন্নয়ন বোর্ডের মালিকানাধীন সংরক্ষিত টার্শিয়ারী সেচ খাল (T-2s4) মে মাসের ১১ তারিখ থেকে ৩০ তারিখের মধ্যে শিতলী ও পায়রাডাঙ্গা এলাকায় ১.৩ কিলোমিটার খনন করা হয়।
পিআইসি’র মাধ্যমে কাজটি করেছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দপ্তর। এতে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছে স্থানীয় বাসিন্দারা।
খননের কাজটি করেন কাপাশহাটিয়া ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মর্জিনা বেগমের স্বামী শরিফুল ইসলাম। যদিও তিনি সকল দায়ভার চাপিয়ে দেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আজিজুর রহমানের ঘাড়ে। তবে তিনিও কোন মন্তব্য না করে এসব প্রতিবেদন বাদ দিতে বলেন।
এতো অনিয়মের পরও নানাভাবে সমালোচনার মুখে পড়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জুন মাসের ১৬ তারিখে অনাপত্তিপত্র নেয় উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, টার্শিয়ারী সেচ খাল (T-2s4) দিয়ে কুষ্টিয়া জিকে সেচ প্রকল্পের পানি পৌছে কৃষকের জমিতে ফলে রক্ষণাবেক্ষণ ও মালিকানা পানি উন্নয়ন বোর্ডের। সেচ প্রকল্পের সংরক্ষিত খালগুলো খনন করা যায় না, শুধুমাত্র পানি সরবরাহের সুবিধার্থে পুনরাকৃতিকরণ করা হয় নির্ধারিত নকশা অনুসরণ করে, যার দায়িত্ব সম্পূর্ণ পানি উন্নয়ন বোর্ডের। সেখানে পাড় সংরক্ষণ এবং খালের তলদেশ থেকে ৬ ইঞ্চি মাটি সরিয়ে পাড়ে দেওয়া হয়। কারণ জমির উপরিভাগের থেকে খালের তলদেশ নিচু হলে পানি পৌঁছাবে না কৃষি জমিতে। সেচ খাল শুধুমাত্র ফসল ফলাতে পানি সেচের জন্য ব্যবহার হয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, সংরক্ষিত এ খালটি খননে কোন নকশা চাওয়া হয়নি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দপ্তর থেকে। সেচ খালের দুই পাড়ের বাহির অংশে গাছ লাগানো যেতে পারে কিন্তু এই খালটিতে সেই নিয়ম না মেনে খাল পাড়ের ভিতরের অংশ দিয়ে কয়েকশত গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। এটি বড় হলে পানি সরবরাহে বাধাগ্রস্থ হবে। এমনকি খননকৃত ডি-১২এক্স কে ড্রেনেজ খালটিও বোর্ডের নকশা না নিয়েই খনন করে।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, 'খালের অধিকাংশ কাজ করা হয়েছে স্কেভেটর মেশিন দিয়ে। শুধুমাত্র সামান্য মাটি সমান ও প্রায় ২শ’ মিটার অংশ চেছে-ছুলে সমান করেছেন শ্রমিক অর্থাৎ উপকারভোগীরা।'
স্থানীয়দের অভিযোগ, 'মেশিনের কারণে খালটির কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু হয়েছে। কোথাও আবার কয়েক ফিট গভীর করা হয়েছে। একারণে জমির তলদেশ থেকে খালের গভীরতা হয়েছে বেশি। পানি প্রবেশের উৎসমুখ হয়েছে গভীর আর জমিতে প্রবেশের মুখের অংশ হয়েছে উঁচু। ফলে পানি জমিতে প্রবেশের পরিবর্তে উজানে গড়াবে। খালটি খননে উপকারের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ হয়েছে সব থেকে বেশি। আবার যখন কোন কর্মকর্তা দেখতে আসতো তখন শ্রমিক থাকতো ভরপুর, অন্য সময় নামমাত্র শ্রমিক থাকতো। এছাড়া কাজের সময় খাল পাড় থেকে কেটে ফেলা হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের অসংখ্য ফলজ-বনজ বৃক্ষ।
উপজেলার শিতলী গ্রামের বাসিন্দা বানাত আলী দুই বিঘা জমিতে ধান চাষ করেন। যদিও এই জমিতে এখন পাট রয়েছে। এই কৃষক বলেন, 'খালটি যেভাবে খনন হয়েছে তাতে সেচের পানি জমিতে যাবে বলে মনে হয় না। একই এলাকার কৃষক ওহিদুল ইসলাম বলেন, 'জমির থেকে খালের গভীরতা হয়েছে বেশী। এতে তো সেচের পানি মাঠে উঠবে না। এটা কৃষকদের জন্য খারাপ-ই হয়েছে।'
অবৈধ ভাবে খননকৃত এই টার্শিয়ারী খালে সেচ সুবিধার আওতায় রয়েছে ১ হাজার ৬ হেক্টর কৃষি জমি। উপজেলার মান্দারতলা এলাকায় সেকেন্ডারী সেচ খাল থেকে এই খালের উৎপত্তি, শেষ পায়রাডাঙ্গা এলাকায়। এদিকে অনুমোদন থাকার পরও ১-ডি-১১-এন (1-D-11-N) ড্রেনেজ খালের ১.৩১ কিলোমিটার অংশে খনন কাজ এখনও শুরু হয়নি বলে জানায় পানি উন্নয়ন বোর্ড।