সর্বশেষ

যৌন বিকৃতি নাকি মানসিক ব্যাধি

যৌন বিকৃতি নাকি মানসিক ব্যাধি

যৌন বিকৃতি নাকি মানসিক ব্যাধি

শিশু নির্যাতন, প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার ও সমাজের নীরব সংকট

জিএম রফিক:

বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন এবং নির্যাতনের পর হত্যার ঘটনা ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। প্রতিটি আলোচিত ঘটনার পর জনমনে একই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কীভাবে একটি শিশুর প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করে? কেন নির্যাতনের পর অনেক ক্ষেত্রে শিশুকে হত্যা করা হয়? এটি কি শুধুই অপরাধপ্রবণতা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও গভীর কোনো মানসিক আচরণগত সংকট?

বিশ্বজুড়ে মনোবিজ্ঞানী, অপরাধবিজ্ঞানী এবং শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞরা বহু বছর ধরে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ—‘প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার

 

মনোরোগবিদ্যার সর্বশেষ নির্দেশিকা DSM-5-TR অনুযায়ী, প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার হলো এমন যৌন আগ্রহ, কল্পনা বা আচরণ যা দীর্ঘস্থায়ী, তীব্র এবং অন্যের ক্ষতির ঝুঁকি সৃষ্টি করে অথবা ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে। সব অপ্রচলিত যৌন আগ্রহকে মানসিক রোগ বলা হয় না; তবে যখন সেটি অন্যের অধিকার, নিরাপত্তা ও সম্মতিকে লঙ্ঘন করে, তখন তা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ডিসঅর্ডার হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ: সবচেয়ে ভয়াবহ সংকেত

বিশ্বের অধিকাংশ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ পেডোফিলিক ডিসঅর্ডারকে সবচেয়ে বিপজ্জনক প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করেন।

ব্রিটানিকা, আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, পেডোফিলিক ডিসঅর্ডার হলো প্রাক-বয়ঃসন্ধিকালীন শিশুদের প্রতি স্থায়ী ও পুনরাবৃত্ত যৌন আকর্ষণ। DSM-5-TR অনুযায়ী এটি তখনই ডিসঅর্ডার হিসেবে বিবেচিত হয় যখন ব্যক্তি সেই তাড়না বাস্তবে প্রয়োগ করে অথবা তা থেকে গুরুতর মানসিক সমস্যা ও সামাজিক বিপর্যয় তৈরি হয়।

 

শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, বাংলাদেশে আলোচিত বহু ঘটনায় দেখা যায় নির্যাতনকারী শিশুর পরিচিত মানুষ। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক, কোচিং শিক্ষক কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠে এসেছে।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শিশুদের দুর্বলতা, ভয় এবং প্রতিবাদ করার সীমিত সক্ষমতা অপরাধীদের কাছে তাদের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।

 

প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডারের অন্ধকার জগত:

মনোরোগবিদ্যার গবেষণায় কয়েকটি বিশেষ ধরনের প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ভয়রিস্টিক ডিসঅর্ডারে অন্যের ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ মুহূর্ত গোপনে পর্যবেক্ষণ করে যৌন উত্তেজনা লাভ করা হয়।

এক্সিবিশনিস্টিক ডিসঅর্ডারে অন্যের সম্মতি ছাড়া নিজের যৌনাঙ্গ প্রদর্শনের প্রবণতা দেখা যায়।

ফ্রটিরিস্টিক ডিসঅর্ডারে জনসমাগমে অপরিচিত ব্যক্তিকে স্পর্শ বা শরীর ঘষে যৌন তৃপ্তি অর্জনের চেষ্টা করা হয়।

সেক্সুয়াল স্যাডিজমে অন্যকে কষ্ট দিয়ে এবং সেক্সুয়াল ম্যাসোসিজমে নিজে কষ্ট পেয়ে যৌন উত্তেজনা অনুভূত হয়।

ফেটিশিস্টিক ডিসঅর্ডারে কোনো নির্দিষ্ট বস্তু, পোশাক বা শরীরের অংশ যৌন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব প্রবণতা তখনই জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন অন্যের সম্মতি অনুপস্থিত থাকে অথবা শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি ঘটে।

 

কেন বাড়ছে যৌন সহিংসতা?

মনোবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, যৌন অপরাধের পেছনে একক কোনো কারণ নেই।

শৈশবে নির্যাতনের অভিজ্ঞতা, সহিংস পর্নোগ্রাফির প্রতি আসক্তি, মাদকসেবন, ব্যক্তিত্বগত সমস্যা, সামাজিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা, অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অভাব—সবকিছু মিলেই ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

আন্তর্জাতিক গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সব শিশু নির্যাতনকারী ব্যক্তি পেডোফিলিক ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত নয়। অনেক অপরাধী ক্ষমতার অপব্যবহার, সুযোগসন্ধানী আচরণ বা সহিংস প্রবণতার কারণেও শিশুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।

 

অনলাইন দুনিয়ায় নতুন বিপদ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপ এবং গোপন অনলাইন গ্রুপ শিশুদের জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন গ্রুমিং এখন বিশ্বব্যাপী শিশু সুরক্ষার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। অপরাধীরা প্রথমে বন্ধুত্ব তৈরি করে, পরে ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা সাক্ষাতের মাধ্যমে শোষণের চেষ্টা করে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে শিশু নির্যাতনমূলক কনটেন্ট এবং শিশুদের লক্ষ্য করে পরিচালিত গোপন নেটওয়ার্কের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

 

সমলিঙ্গ আকর্ষণ নিয়ে সমাজে বিতর্ক

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে সমলিঙ্গ আকর্ষণ নিয়ে সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিতর্ক রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বিষয়টি এখন আগের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান।

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং আধুনিক মনোরোগবিদ্যার অবস্থান হলো, প্রাপ্তবয়স্কদের পারস্পরিক সম্মতিসূচক সমলিঙ্গ আকর্ষণকে মানসিক রোগ বা প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার হিসেবে গণ্য করা হয় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৯০ সালে সমকামিতাকে রোগের তালিকা থেকে বাদ দেয় এবং পরবর্তী সময়েও একই অবস্থান বজায় রেখেছে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমলিঙ্গ আকর্ষণ এবং পেডোফিলিক ডিসঅর্ডার সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। একটি হলো যৌন অভিমুখিতা (sexual orientation) সম্পর্কিত প্রশ্ন, অন্যটি শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ, যা শিশু সুরক্ষা, মানবাধিকার ও ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনও স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে পেডোফিলিক ডিসঅর্ডার কোনো যৌন অভিমুখিতা নয়; এটি প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডারের একটি ধরন।

 

চিকিৎসা, নজরদারি প্রতিরোধ

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, যৌন অপরাধ প্রতিরোধে কেবল আইন যথেষ্ট নয়।

ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ শনাক্ত করা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা, শিশু সুরক্ষা বিষয়ে পরিবারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, অনলাইন নিরাপত্তা জোরদার করা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু নির্যাতনকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি জনস্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তারও একটি বড় সংকট।