আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নবজাতক মৃত্যু: দুর্ঘটনা, অবহেলা নাকি ব্যবস্থাপনাগত সংকট ?
তদন্তে বিলম্বে বাড়ছে প্রশ্ন
জি এম রফিক:
রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগ ও আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিআইডি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পৃথকভাবে তদন্ত শুরু করলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় নতুন করে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জনমনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এটি কি নিছক কোনো প্রযুক্তিগত দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ত্রুটি ও তদারকির ঘাটতি?
সরকারি তদন্ত কমিটিকে প্রথমে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হলেও পরে তারা অতিরিক্ত সময়ের আবেদন করে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মৃত নবজাতকদের মায়েদের বক্তব্য গ্রহণসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কাজ শেষ না হওয়ায় তদন্তে সময় বাড়ানো হয়েছে।
কী ঘটেছিল সেই রাতে
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে ১১ জন মা চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের মধ্যে ছয় নবজাতক নিজ নিজ মায়ের সঙ্গে একই কক্ষে অবস্থান করছিল। ভোর ৬টা থেকে সকাল সাড়ে ৯টার মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে একে একে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে তারা জানান, সংশ্লিষ্ট কক্ষটির পরিবেশ ছিল অত্যন্ত বদ্ধ ও অস্বস্তিকর। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি), ভেন্টিলেশন, অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা কিংবা অন্য কোনো কারিগরি ত্রুটির কারণে পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। তবে চূড়ান্ত তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তদন্তে কেন বাড়ছে সন্দেহ:
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো হাসপাতালে একই কক্ষে অল্প সময়ের ব্যবধানে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যু অত্যন্ত অস্বাভাবিক ঘটনা।
তাদের মতে, কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন—
সব নবজাতকের মৃত্যু একই সময়সীমার মধ্যে ঘটেছে;
তারা একই ওয়ার্ডে অবস্থান করছিল;
কক্ষটির ভেন্টিলেশন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগও আনা হয়েছে;
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এখনো মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করতে পারেনি।
স্বাস্থ্য প্রশাসনের একজন সাবেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এ ধরনের ঘটনায় প্রযুক্তিগত, চিকিৎসাগত এবং প্রশাসনিক—এই তিন স্তরে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কোনো স্তরে ব্যর্থতা থাকলে দায় নির্ধারণ করতেই হবে।”
হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় কি ছিল গাফিলতি?
তদন্ত এখনো চলমান থাকায় কোনো কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত মন্তব্য করেনি। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক মোঃ জাহিদ রায়হান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট কক্ষটি পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী ছিল না।
তার এই বক্তব্যের পর নতুন করে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—
ওয়ার্ডটি কি অনুমোদিত মানদণ্ড পূরণ করেছিল?
সেখানে নিয়মিত নিরাপত্তা পরিদর্শন করা হতো কি না?
এসি ও অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ কতটা মানসম্পন্ন ছিল?
হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ তদারকি ব্যবস্থা কার্যকর ছিল কি না?
স্বাস্থ্যখাত বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
মামলা হয়েছে, কিন্তু উত্তর এখনো নেই
ঘটনার পর মৃত নবজাতকদের পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা ও ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এখন পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি।
আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাড. মনিয়ারা খানম প্রভাতী খবরকে বলেন, "তদন্তে যদি অবহেলা, দায়িত্বহীনতা বা নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি দায় সৃষ্টি হতে পারে"।
বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতে জবাবদিহির সংকট
বাংলাদেশে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও এর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিকারকর্মীদের অভিযোগ—
অনেক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা হয় না;
আইসিইউ, এনআইসিইউ ও পোস্ট-অপারেটিভ ইউনিটে মান নিয়ন্ত্রণ দুর্বল;
রোগী নিরাপত্তা নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না;
অভিযোগ তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়;
ভুক্তভোগী পরিবার অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার পায় না।
তাদের মতে, আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই ঘটনা শুধু একটি হাসপাতালের নয়; বরং গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।
আর্থিক স্বচ্ছতা ও কর পরিশোধ নিয়ে কী জানা গেছে
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ড, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, কর প্রদান ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক লেনদেন নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর সাবেক এক কর্মকর্তা প্রভাতী খবরকে বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কর ফাঁকি বা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করতে হলে অডিট রিপোর্ট, কর রিটার্ন, ব্যাংক লেনদেন, সম্পদ বিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক নথিপত্র পর্যালোচনা করতে হয়।
অতীতের অভিযোগগুলো কি নতুন করে খতিয়ে দেখা দরকার?
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, বর্তমান তদন্ত কেবল একটি দিনের ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বরং প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তাদের মতে তদন্তে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত—
পূর্বের চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ;
মাতৃমৃত্যু ও নবজাতক মৃত্যুর রেকর্ড;
রোগী নিরাপত্তা নীতিমালা;
লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রক্রিয়া;
অগ্নিনিরাপত্তা ও ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা;
জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বচ্ছতা।
তাদের ভাষায়, “একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যু একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। জনগণ জানতে চায় কী ঘটেছে, কেন ঘটেছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অপরাধ বিশ্লেষকরাও মনে করেন, যদি প্রযুক্তিগত ত্রুটি, চিকিৎসা অবহেলা কিংবা প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে দায় নির্ধারণে কোনো ধরনের প্রভাব বা চাপ যেন কাজ না করে তা নিশ্চিত করা জরুরি।
বক্তব্য জানতে যোগাযোগ
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোঃ সাখাওয়াত হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। একইভাবে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতের মুঠোফোনেও একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক মোঃ জাহিদ রায়হানের কাছে ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রভাতী খবরকে বলেন, “আমি মাননীয় মন্ত্রীর সঙ্গে আছি, এই মুহূর্তে কথা বলতে পারছি না।” এরপর তিনি ফোন রেখে দেন।
অন্যদিকে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসন বিভাগের ম্যানেজার মাহাফুজ হাসান প্রভাতী খবরকে বলেন, “নবজাতকদের মৃত্যুর ঘটনায় সরকার কর্তৃক একটি তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে শুনেছি। এর বেশি কিছু আমি জানি না।”
বিষয়টি নিয়ে আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পক্ষ থেকে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি।”
তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে দেশ
বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তদন্ত প্রতিবেদনে কী উঠে আসবে?
ঘটনাটি কি শুধুই একটি প্রযুক্তিগত দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ত্রুটি ও তদারকির ঘাটতি?
সরকারি তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিতই থেকে যাচ্ছে। তবে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর এই ঘটনা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার নিরাপত্তা, জবাবদিহি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এখন সবার দৃষ্টি তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে। কারণ সেই প্রতিবেদনই নির্ধারণ করবে—এটি কেবল একটি দুর্ঘটনা ছিল, নাকি আরও বড় কোনো ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।