কক্সবাজারে পাঁচ মাসে ৫৩ হত্যা, ৭ ডাকাতি, ১৪ ছিনতাই
নিজস্ব প্রতিবেদক:
কক্সবাজারের নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নে ৮ জুন সশস্ত্র ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাত দলের সদস্যরা ঘরের জানালার গ্রিল কেটে ভেতরে ঢুকে আলমারি থেকে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুট করে। যাওয়ার আগে তারা গৃহবধূ ও তাঁর দশম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়েকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করে।
চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। পাঁচ আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
একইভাবে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার শিলখালী ইউনিয়নের জারুলবনিয়া এলাকার মোহাম্মদ সাকিবের বসতঘরে গত শুক্রবার রাতে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাতরা দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে পরিবারের সদস্যদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে। এর পর মোবাইল ফোন, স্বর্ণ ও নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায়।
মোহাম্মদ সাকিব পেকুয়ার শিলখালী ইউনিয়নের ছাত্রদলের সদস্য সচিব। তিনি জানান, ডাকাত দলের সদস্যরা মালপত্র লুট করে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে জানানো হয়। এর পরপরই পেকুয়া থানা থেকে ফোন আসে। তারা জানায়, প্রধানমন্ত্রী পেকুয়া সফর শেষ করার পর এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শুধু এ দুই ডাকাতিতে শেষ নয়; স্থানীয় একাধিক জনপ্রতিনিধির তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলায় অন্তত ১২টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এর অধিকাংশই চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় ঘটেছে। এ ছাড়া আটটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
তবে পুলিশের তথ্যমতে, গত পাঁচ মাসে চকরিয়ায় দুটি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। পেকুয়ায় কোনো ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি।
জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক কার্যবিবরণী থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জেলায় গত ডিসেম্বর মাসে একটি ডাকাতি, চারটি ছিনতাই ও ছয়টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে দুটি ডাকাতি, চারটি ছিনতাই ও ১৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। ফেব্রুয়ারিতে দুটি ডাকাতি, দুটি ছিনতাই ও ১০টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। মার্চে দুটি ডাকাতি, তিনটি ছিনতাই ও ১২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এপ্রিলে একটি ছিনতাই ও ১০টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ মাসে ডাকাতির ঘটনা নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে সভার কার্যবিবরণীতে।
গত সোমবার কক্সবাজার শহরের হাসপাতাল সড়কে দলীয় কার্যালয়ে কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও উন্নয়ন ভাবনা নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা করে জামায়াতে ইসলামী। সভায় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, কক্সবাজারে খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ বেড়ে যাওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক পর্যায়ে চলে গেছে।
জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজারে হঠাৎ অপরাধ কর্মকাণ্ড বেড়েছে। খুন, অপহরণ ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। হত্যাকাণ্ড ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য জেলার ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জনবল সংকটের মধ্যেও অভিযান অব্যাহত রেখেছে পুলিশ। তবে অপরাধীদের বেপরোয়া উৎপাতে পর্যটননির্ভর এ জেলার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এখন ঝুঁকির মুখে।
মাতামুহুরীর পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান হারুন উর রশিদ বলেন, বিগত সরকারের সময়ের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী সন্ত্রাসী বর্তমানে এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন নতুন অপরাধীদের ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো হচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আগে থেকে সচেতন থাকার জন্য উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বলা হলেও পুলিশ কিছু চুনোপুঁটি গ্রেপ্তার করলেও বড় সন্ত্রাসীরা অধরা রয়ে যাচ্ছে। ফলে দিন দিন খুন, ডাকাতি ও চুরির মতো ঘটনা বেড়েই চলেছে। এলাকার বড় সন্ত্রাসীদের আটকাতে না পারলে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
চকরিয়া থানার ওসি মনির হোসেন বলেন, পুলিশ চিহ্নিত অপরাধীদের আটক করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠালেও অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। তাই অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলা সদর, টেকনাফ, রামু, উখিয়া, কুতুবদিয়াসহ কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় গত পাঁচ মাসে অপরাধের মধ্যে হত্যাকাণ্ড বেশি ঘটেছে। এসব ঘটনার পেছনে জমিসংক্রান্ত বিরোধ, ব্যক্তিগত শত্রুতা, প্রেমঘটিত দ্বন্দ্ব এবং অপহরণের পর হত্যা– এ ধরনের কারণ বেশি ছিল। পাশাপাশি অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারের ঘটনাও বেড়েছে।
সম্প্রতি আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে জেলা সদরের পিএমখালীর পরানিয়াপাড়ায় যুবক মুবিনকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা, খুরুশকুলের পাহাড়ি এলাকায় মন্দিরের পুরোহিত নয়ন সাধুর লাশ উদ্ধার এবং কলাতলীতে টমটমচালক শওকত আলম হত্যাকাণ্ড। এসব ঘটনায় কিছু সন্দেহভাজন আটক হলেও একাধিক ঘটনায় মূল আসামিরা এখনও গ্রেপ্তার হয়নি।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) কক্সবাজার জেলার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজারে অপরাধপ্রবণতা বেড়েছে। অপরাধের মধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকায় হত্যাকাণ্ড হলেও ডাকাতির অধিকাংশই ঘটছে চকরিয়া উপজেলায়। প্রায় প্রতি রাতেই ওই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। যেভাবে অপরাধ বাড়ছে, তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। পর্যটননির্ভর একটি জেলার জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি যেমন জনজীবনকে অস্থির করে তুলছে, তেমনি দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) মো. অহিদুর রহমান বলেন, প্রতিদিন গড়ে শতাধিক আসামি গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু আলোচিত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু কক্সবাজারে পুলিশের পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।