শিশুকে অপহরণের পর হত্যা মামলায় দুই ভাইসহ তিনজনের মৃত্যদণ্ড, দুইজনের যাবজ্জীবন
আদালত প্রতিবেদক:
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার ভাটিয়াপাড়া এলাকায় শিশু মাহফুজকে অপহরণের পর হত্যা মামলায় দুই ভাইসহ তিনজনকে মৃত্যদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছেন ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে রায়ে আসামি বিল্লাল শেখ ও মাহমুদা খানম উষাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশও দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
মঙ্গলবার ঢাকার ৪ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক ফারজানা ইয়াসমিন এই রায় ঘোষণা করেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন দুই সহোদর জামাল শেখ ও রঞ্জু শেখ এবং শেখ শামীম আহমেদ নামের আরেকজন।
রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামির শিশু মাহফুজকে অপহরণ করতে ও অপহরণে সহায়তার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশও দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। আর আসামি মাহমুদা খানম উষার হত্যা ও অপহরণের উভয় আইনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
রায়ে সাব্বির ওরফে রাজীবের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া তাকে খালাস এবং অপহরণের অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া আসামি মিজানুর রহমান মিজান, কামনা বেগম, শেখ সোহরাব, তুহিন শেখ, শেখ সাকিব আহম্মেদ, রাকিব শেখ, সাব্বির আহম্মেদ, মিনারুল ইসলাম ও মঞ্জু শেখকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
রায়ের আগে পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, এটি কেবল একটি হত্যা মামলা নয়; বরং মানুষের রূপধারী কিছু অপরাধীর হিংস্রতার শিকার এক নিষ্পাপ শিশুর মর্মান্তিক পরিণতির দলিল। শবে বরাতের পবিত্র রাতে নামাজ পড়তে বের হওয়া আট বছরের মাহফুজকে অপহরণ করে মুক্তিপণের লোভে প্রায় দেড় মাস আটকে রাখা হয়। পরে অর্থ না পেয়ে নির্মমভাবে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় এবং মরদেহ মেহগনি বাগানে ফেলে দেওয়া হয়। এ ধরনের নৃশংস ও পাশবিক অপরাধ সমাজে আর কেউ যাতে করার সাহস না পায়, সে জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন বলেন,‘আসামিরা পলাতক রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।’
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০১২ সালের ৫ জুলাই শবেবরাতের রাতে কাশিয়ানী উপজেলার বরাশুর গ্রামের বাড়ি থেকে ভাটিয়াপাড়া রেলওয়ে জামে মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় অপহৃত হয় ইতালিপ্রবাসী রেজাউল ইসলামের ৮ বছরের ছেলে মাহফুজ।
পরদিন মাহফুজের পরিবারকে ফোন করে ৭০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। ওইদিনই মাহফুজের মা স্বপ্না বেগম কাশিয়ানী থানায় একটি মামলা করেন।
তদন্তে নেমে পুলিশ মেহেদী হাসান ও মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেনকে আটক করে আদালতে হাজির করলে তারা পারিবারিক শত্রুতার জেরে মাহফুজকে অপহরণ ও হত্যার কথা স্বীকার করেন। গলায় ফাঁস দিয়ে তারা মাহফুজকে হত্যা করে বলে তদন্তে বেরিয়ে আসে। দীর্ঘ ৪৫ দিন অপহরণের পর আটকে রেখে শিশুটিকে নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। ২০ অগাস্ট ঈদের দিন রাতের বেলা শিশুটির লাশ বাড়ির পাশে ফেলে রেখে যায়। এ ঘটনায় ২১ অগাস্ট স্বপ্না বেগম সম্পূরক এজাহার দায়ের করেন।
মামলাটি তদন্ত শেষে একই বছরের ২০ নভেম্বর কাশিয়ানী থানার এসআই নিজাম শিকদার ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র জমা। মেহেদী ও সাদ্দাম শিশু হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে দেয়া হয় দোষীপত্র।
২০১৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মামলার অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। বিচার চলাকালে ট্রাইব্যুনাল ২৫ জন সাক্ষীর মধ্যে ২৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করে। আসামিদের পক্ষে ৮ জন সাফাই সাক্ষ্য দেন।
উল্লেখ্য, মেহেদী ও সাদ্দামকে ২০১৫ সালের ৯ নভেম্বর ১০ বছরের সাজা দেন একই ট্রাইব্যুনাল।