অটিজম চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত ?
পাঁচ দিনের মস্তিষ্ক উদ্দীপনা থেরাপিতে আশার আলো, তবে সতর্ক থাকার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
জিএম রফিক:
পর্ব–১ : গবেষণার নতুন দিগন্ত, আশার আলো নাকি নতুন প্রশ্নের সূচনা?
অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD) নিয়ে গত দুই দশকে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক গবেষণা হলেও সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতা উন্নয়নে কার্যকর নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি এখনো চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের জন্য বর্তমানে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, বিহেভিয়ারাল ইন্টারভেনশন, বিশেষ শিক্ষা এবং পরিবারভিত্তিক সহায়তাকেই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু এসব সেবার পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই এমন একটি নিরাপদ, কার্যকর ও সহজে প্রয়োগযোগ্য প্রযুক্তি খুঁজছেন, যা শিশুদের সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতা আরও উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে।
এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী The BMJ (British Medical Journal)-এ প্রকাশিত চীনের একটি বহুকেন্দ্রিক গবেষণা আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, Accelerated Continuous Theta Burst Stimulation (a-cTBS) নামে একটি নন-ইনভেসিভ বা অস্ত্রোপচারবিহীন মস্তিষ্ক উদ্দীপনা প্রযুক্তি অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের সামাজিক যোগাযোগ এবং ভাষাগত দক্ষতা উন্নয়নে ইতিবাচক ফল দেখিয়েছে। তবে একই সঙ্গে গবেষকরা জোর দিয়ে বলেছেন, এটিকে এখনই অটিজমের "নতুন চিকিৎসা" হিসেবে ঘোষণা করার সময় আসেনি।
কেন আলোচনায় এই গবেষণা ?
গবেষণাটি প্রকাশিত হওয়ার পর চিকিৎসাবিজ্ঞানী, শিশু বিশেষজ্ঞ, নিউরোসায়েন্টিস্ট, মনোবিজ্ঞানী এবং অটিজম নিয়ে কাজ করা গবেষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কারণ, অটিজমের ক্ষেত্রে নতুন কোনো প্রযুক্তি নিয়ে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলেও তা খুব কম ক্ষেত্রেই বড় পরিসরের র্যান্ডমাইজড ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে প্রমাণিত হয়।
চীনের এই গবেষণাটি ছিল একটি Multicentre Randomised Sham-Controlled Clinical Trial—যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে সর্বোচ্চ মানের গবেষণা পদ্ধতিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে অংশগ্রহণকারী শিশুদের একটি দলকে প্রকৃত চিকিৎসা এবং অন্য দলকে শ্যাম (Sham) চিকিৎসা দেওয়া হয়, যাতে গবেষণার ফলাফল পক্ষপাতমুক্তভাবে মূল্যায়ন করা যায়।
কারা পরিচালনা করেছেন গবেষণাটি?
গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন সাংহাইভিত্তিক গবেষক হ্যাংইউ ট্যান (Hangyu Tan), সহযোগী অধ্যাপক তাই রেন (Tai Ren), প্রধান চিকিৎসক আইহুয়া কাও (Aihua Cao) এবং তাঁদের সহকর্মীরা।
গবেষণাটি পরিচালিত হয় চীনের তিনটি একাডেমিক হাসপাতালে। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে ৪ থেকে ১০ বছর বয়সী ২০০ জন অটিজমে আক্রান্ত শিশুকে এই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অংশগ্রহণকারী শিশুদের প্রায় অর্ধেকের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতাও ছিল। ফলে গবেষণাটি শুধু তুলনামূলক সক্ষম শিশুদের নয়, অপেক্ষাকৃত জটিল অবস্থার শিশুদের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করেছে।
গবেষণাটি অর্থায়ন করেছে National Natural Science Foundation of China, China Brain Initiative Grant, Shanghai Municipal Commission of Health-সহ চীনের একাধিক শীর্ষ গবেষণা ও সরকারি প্রতিষ্ঠান। ফলে গবেষণাটি শুধু একটি হাসপাতালের উদ্যোগ নয়; বরং জাতীয় পর্যায়ের বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার ফল।
কী এই a-cTBS?
Accelerated Continuous Theta Burst Stimulation (a-cTBS) হলো ট্রান্সক্র্যানিয়াল ম্যাগনেটিক স্টিমুলেশন (TMS)-এর একটি আধুনিক রূপ। এতে মাথার খুলিতে কোনো অস্ত্রোপচার করা হয় না। বাইরে থেকে বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে অতি ক্ষুদ্র চৌম্বকীয় উদ্দীপনা দেওয়া হয়।
চীনের গবেষণায় শিশুদের মস্তিষ্কের Left Primary Motor Cortex লক্ষ্য করে টানা পাঁচ দিন প্রতিদিন ১০টি সেশন পরিচালনা করা হয়। গবেষকদের ধারণা, মস্তিষ্কের এই অংশ শুধু নড়াচড়ার সঙ্গেই নয়, ভাষা ও সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন স্নায়বিক নেটওয়ার্কের সঙ্গেও সম্পর্কিত। সেই কারণেই এই অংশকে লক্ষ্য করে উদ্দীপনা দেওয়া হয়।
কী ফল পাওয়া গেছে?
গবেষণার ফলাফল চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কারণ, a-cTBS গ্রহণকারী শিশুদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতার উন্নতি শুধু চিকিৎসা শেষে নয়, এক মাস পরও পরিমাপযোগ্যভাবে বজায় ছিল। ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে।
গবেষণায় কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন—সাময়িক অস্থিরতা, মাথার ত্বকে অস্বস্তি বা হালকা অস্বস্তিবোধ। তবে গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো অতিরিক্ত চিকিৎসা ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে সেরে যায়।
আশার আলো, নাকি এখনো দীর্ঘ পথ?
গবেষণার ফল আশাব্যঞ্জক হলেও গবেষকরা নিজেরাই সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, গবেষণার অনুসরণকাল ছিল মাত্র এক মাস। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা, নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শিশুদের ক্ষেত্রে একই ধরনের ফল পাওয়া যাবে কি না—তা নিশ্চিত করতে আরও বড় পরিসরের আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রয়োজন।
একই সংখ্যায় প্রকাশিত সম্পাদকীয় নিবন্ধেও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নতুন এই প্রযুক্তি অটিজম ব্যবস্থাপনায় একটি সম্ভাবনাময় সংযোজন হতে পারে, কিন্তু এটি কোনোভাবেই স্পিচ থেরাপি, বিহেভিয়ারাল থেরাপি, বিশেষ শিক্ষা বা পরিবারভিত্তিক সহায়তার বিকল্প নয়। বরং ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মিললে এটি একটি পরিপূরক চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।