এক নজরে মূল অভিযোগসমূহ:
রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে প্রশাসনিক সুবিধা গ্রহণ
প্রকৌশলী সমিতির রাজনীতিতে অতিমাত্রায় সক্রিয় ভূমিকা
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ না করা
প্রায় তিন মাস কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ
প্রশাসনিক প্রশ্নের মুখে মামলা করার ভয় দেখানো
ব্যারিস্টারি ডিগ্রি দেখিয়ে সহকর্মীদের ওপর চাপ প্রয়োগ
সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়া একাধিকবার বিদেশ ভ্রমণ
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) এক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে ঘিরে দীর্ঘদিনের নানা অভিযোগ নতুন করে সামনে আসতে শুরু করেছে। বগুড়া (শান্তাহার) ওয়ার্কশপ সার্কেলের এই তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর নাম সরোয়ার জাহান। যিনি কখনো প্রকৌশলী সমিতির রাজনীতিতে সক্রিয় থেকে, আবার কখনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে বারবার আলোচনায় এসেছেন। বর্তমানে তাকে ঘিরে দাপ্তরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, প্রশাসনিক জবাবদিহির অভাব ও সরকারি বিধি লঙ্ঘনের মতো গুরুতর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব খাটানো, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা উপেক্ষা করা, দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, সরকারের অনুমোদন ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ এবং প্রশাসনিক প্রশ্নের মুখে সহকর্মীদের আইনি পদক্ষেপের হুমকি দেওয়ার মতো একাধিক অভিযোগ ইতোমধ্যে সওজের অভ্যন্তরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সওজের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে এবং প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব অভিযোগের একটি সামগ্রিক চিত্র উঠে এসেছে। যদিও এসব অভিযোগের অনেকগুলোর বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত হয়নি, তবু সংশ্লিষ্ট মহলে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
প্রকৌশলী সমিতির রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা:
সওজের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সরোয়ার জাহান সওজ প্রকৌশলী সমিতির রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্যভাবে সক্রিয় ছিলেন। সে সময় তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থিত একটি প্যানেলের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে পরপর দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে একই প্যানেলের কোষাধ্যক্ষ হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন বলে জানা গেছে।
সওজের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, ওই সময় প্রকৌশলী সমিতির নির্বাচনগুলোতে রাজনৈতিক বিভাজন ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সমর্থিত প্যানেলগুলো প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করত—এমন ধারণা অধিদপ্তরের ভেতরে অনেকের মধ্যেই ছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, “সমিতির রাজনীতির কারণে অনেক সময় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও অঘোষিত প্রভাব তৈরি হতো। এতে সাধারণ ও পেশাদার অনেক কর্মকর্তা অস্বস্তি বোধ করতেন।”
প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ:
সওজের কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অতীতে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সরোয়ার জাহান অনেক ক্ষেত্রেই বাড়তি প্রশাসনিক সুবিধা পেয়েছেন বলে তাদের ধারণা। তাদের অভিযোগ—বিভিন্ন সময় পদায়ন, দায়িত্ব বণ্টন কিংবা প্রশাসনিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে তিনি অনানুষ্ঠানিক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেছেন।
একজন কর্মকর্তা বলেন, “রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তিনি অনেক সময় প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে থেকেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করতেন।” যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি কোনো লিখিত প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি, তবে একাধিক কর্মকর্তা একই ধরনের অভিযোগ করেছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা উপেক্ষার অভিযোগ:
সরোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে যে অভিযোগটি সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, তা হলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ না করা। সওজের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, প্রশাসনিক কাজে অনেক সময় তিনি নিজস্ব ব্যাখ্যা বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
একজন ভুক্তভোগী কর্মকর্তা বলেন, “অনেক সময় দেখা গেছে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট নির্দেশনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি নিজের মতো করে কাজ এগিয়ে নিয়েছেন।” আরেক কর্মকর্তা বলেন, “প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের যে নিয়মতান্ত্রিক ও চেইন অব কমান্ডের প্রক্রিয়া রয়েছে, অনেক সময় সেটি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে তার বিরুদ্ধে শক্ত অভিযোগ রয়েছে।” তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের তথ্য পাওয়া যায়নি।
টানা তিন মাস কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ:
সরেজমিন অনুসন্ধানে আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে। গত প্রায় তিন মাস ধরে সরোয়ার জাহান নিয়মিতভাবে অফিসে উপস্থিত ছিলেন না—এমন অভিযোগ করেছেন খোদ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী। তাদের দাবি, এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে অফিসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজ বাধ্য হয়ে অন্য কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে।
এ বিষয়ে একজন কর্মকর্তা বলেন, “তিনি নিয়মিত অফিসে আসছেন না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে। এর ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কাজ বিলম্বিত হচ্ছে এবং সেবাপ্রার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।” তবে তার এই দীর্ঘ অনুপস্থিতির পেছনে কোনো সরকারি ছুটি, প্রশিক্ষণ বা অন্য কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছিল কি না—তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
ব্যারিস্টারি ডিগ্রি ঘিরে বিতর্ক ও মামলার হুমকি:
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রকৌশলী হওয়ার পাশাপাশি সরোয়ার জাহান ব্যারিস্টারি ডিগ্রিও অর্জন করেছেন। যদিও তিনি পেশাগতভাবে আইনজীবী হিসেবে কাজ করেন না। কিছু কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, মাঝে মাঝেই তিনি তার এই ডিগ্রির বিষয়টি সামনে এনে প্রশাসনিক প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং একধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করেন।
সরেজমিনে এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে সরোয়ার জাহান সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। বরং অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি আদালতে মামলা করার আশঙ্কা দেখিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। একাধিক সূত্রের দাবি, সমালোচনা বা প্রশাসনিক প্রশ্ন উঠলেই তিনি আইনি পদক্ষেপ বা আইনি জটিলতার কথা উল্লেখ করেন। একজন কর্মকর্তা বলেন, “তিনি অনেক সময় বলেন যে, আইনের বিষয়ে তিনি ভালো জানেন এবং প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন।”
অনুমোদন ছাড়া বিদেশ ভ্রমণের অভিযোগ:
সরকারি চাকরি বিধানে সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বিদেশ ভ্রমণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক বা জিও (GO) থাকা আবশ্যক। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সরোয়ার জাহান একাধিকবার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন যেখানে সরকারের সেই অনুমোদন যথাযথভাবে নেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এ ধরনের ভ্রমণ সরকারি বিধি-বিধানের সরাসরি পরিপন্থী। তবে এ বিষয়ে সরকারি কোনো দাপ্তরিক নথি বা আনুষ্ঠানিক তদন্তের তথ্য এখনো সামনে আসেনি।
জবাবদিহির প্রশ্ন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি:
প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীল পদে থাকা কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, ক্ষমতার অপব্যবহার বা বিধি লঙ্ঘনের এমন গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তবে তা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সওজের বিভিন্ন স্তরের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করেন, এসব পুঞ্জীভূত অভিযোগের কারণে অধিদপ্তরের সার্বিক প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই অভিযোগগুলোর বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য বা মিথ্যা—যাই হোক না কেন, একটি স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া জরুরি। একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “তদন্ত হলে প্রকৃত তথ্য সামনে আসবে এবং অধিদপ্তরের ভেতরের অযথা বিতর্কের অবসান হবে।”
অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য:
উল্লিখিত এতসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বগুড়া (শান্তাহার) ওয়ার্কশপ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সরোয়ার জাহানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য বা বক্তব্য পাওয়া যায়নি।