ডেস্ক রিপোর্টার
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কারাবন্দি এক আওয়ামী লীগ নেতাকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেয়ার জন্য পরিবারের কাছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারের এক কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার ঘটনার যে অডিও রেকর্ড ফাঁস হয়েছে, সেটির বিষয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়। সদ্য সাবেক এক প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে জামিন করিয়ে দেয়ার জন্য এক কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ ওঠার পর এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির নাম দেয়া হয়েছে ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি’। দুটি বিষয়কে সামনে রেখে এই কমিটি কাজ করবে বলে মানবজমিনকে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। প্রসিকিউটরের ঘুষ দাবির খবর প্রকাশের পর তোলপাড় চলছে বিচারাঙ্গনে। এই ঘটনা নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়। অভিযুক্ত প্রসিকিউটরকে সোমবারই অব্যাহতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন মন্ত্রণালয়। যদিও কেন তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে তার কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
ঘটনার তদন্তের বিষয়ে গতকাল বৈঠকের ফাঁকে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এক প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে উঠা এই অভিযোগের বিষয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত করবেন প্রসিকিউশন। যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় তবে ব্যবস্থা নিতে সরকারকে অনুরোধ জানাবে প্রসিকিউশন। এ সময় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তিনি। সূত্র জানায়, সাংবাদিকদের ব্রিফিং শেষে দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে পুনরায় বৈঠকে বসে পুরো প্রসিকিউশন বিভাগ। বৈঠকে চিফ প্রসিকিউটরকে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত করে সরকারকে সুপারিশ দেবে। সন্ধ্যায় বৈঠক সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে আরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, ট্রাইব্যুনালের সিনিয়র প্রসিকিউটর মো. আব্দুস সোবহান তরফদার ও সদ্য নিয়োগ পাওয়া দু’জন প্রসিকিউটর মার্জিনা রায়হান (মদিনা) ও মোহাম্মদ জহিরুল আমিন। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ল’রিসার্চ অফিসার সিফাতুল্লাহকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
দুটি বিষয়কে সামনে রেখে তদন্ত হবে: গতকাল রাতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, আজকে দুটি অভিযোগের ব্যাপারে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির নাম দিয়েছি ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি’। আমরা আজ (বুধবার) বসে কমিটির কর্মপরিকল্পনা ঠিক করবো। আমরা সব পক্ষকে ডাকবো। বিশেষ করে আমরা ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলবো। আমরা জানতে চাইবো কীসের ভিত্তিতে এই টাকা চাওয়া হয়েছে। কোনো লেনদেন হয়েছিল কিনা। চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, আমরা সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে রাজসাক্ষী করা নিয়ে যে অথনৈতিক লেনদেনের অভিযোগের কথা শোনা যাচ্ছে এ বিষয়ে তদন্ত করবো। এ ছাড়া সদ্য অভিযোগ ওঠা প্রসিকিউটর সাইমুম রেজার সঙ্গে অডিও কলের বিষয়ে তদন্ত করবো। আমরা কোনো অনৈতিক লেনদেনকে প্রশ্রয় দিবো না। আমি দৃঢ় ভাবে বলতে পারি যে, আমি চিফ প্রসিকিউটর থাকা কালে কোনো ধরনের অনিয়ম বিশেষ করে কোনো অর্থনৈতিক লেনদেনের প্রশ্নই আসে না। এই বিচার প্রক্রিয়াটা প্রশ্নবিদ্ধ হোক এমন কোনো কাজকেই আমরা প্রশ্রয় দিবো না।
ঘুষের অভিযোগ বিচার প্রক্রিয়াকে শতভাগ প্রশ্নবিদ্ধ করবে: বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী। তাকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেয়ার জন্য তার পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা চেয়েছিলেন সদ্য পদত্যাগ করা প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদার এমন ফোনালাপ প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন মাধ্যমে। ঘুষের এ অভিযোগ বিচারপ্রক্রিয়াকে শতভাগ প্রশ্নবিদ্ধ করে বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। গতকাল চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে করা সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, কোনো প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলে অবশ্যই ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আমাদের ইমেজ সংকট হয়, বিচার প্রক্রিয়া শতভাগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তবে আমি আগেই বলেছিলাম যে আমার কর্মকালে কোনো প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ন্যূনতম দুর্নীতির অভিযোগ এলে বরদাশত করা হবে না। বৈঠক করে প্রত্যেক প্রসিকিউটরকে আমি একই কথা বলেছি। আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কাজ করতে হলে নির্লোভ হতে হবে। লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থাকতে হবে সবাইকে। এমন না হতে পারলে এখানে থাকার প্রয়োজন নেই। যে কেউই চলে যেতে পারবেন। প্রসিকিউটরের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা সিরিয়াস অভিযোগ, এই অভিযোগ আমাদের কোনো প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ওঠার কথা ছিল না। অভিযোগ যখন উঠেছে, তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া উচিত ছিল। এর প্রশ্রয় কেন দিয়েছি জানি না। হতে পারে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ তার (সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম) কাছে আসেনি। মিডিয়াতে নানা অভিযোগ থাকলেও যতক্ষণ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে না আসবে, আমাদের পক্ষে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকে না। সম্পাদনা- কামরুজ্জামান মিল্টন: