অন্যান্য

পুলিশে বাধ্যতামূলক অবসর আতঙ্ক

পুলিশে বাধ্যতামূলক অবসর আতঙ্ক


নিজস্ব প্রতিবেদক
পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) পদমর্যাদার পাঁচ কর্মকর্তাকে একযোগে গত রবিবার বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার। দীর্ঘদিন ধরে ‘রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত’ হয়ে আসা পুলিশ বাহিনীর সংস্কার ও পুনর্গঠনের অংশ হিসেবেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আরও পুলিশ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হচ্ছে বলে বাহিনীটির বিভিন্ন পর্যায়ে খবর চাউর হয়েছে। এ নিয়ে কোনো কোনো পুলিশ কর্মকর্তার মধ্যে আতঙ্ক শুরু হয়েছে। এমন অবস্থার মধ্যেই সুযোগসন্ধানী পুলিশ কর্মকর্তারা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন।
অনেক কর্মকর্তার মতে, স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে আবারও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে মূল্যায়নের সংস্কৃতি
ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে পুলিশ প্রশাসনে।
একাধিক সূত্র বলছে, পুলিশের কিছু অতি উৎসাহী কর্মকর্তা নিজেদের স্বার্থে বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তাদের নিয়ে তালিকা তৈরি করছে। তালিকাভুক্তদের ‘আওয়ামী ফ্যাসিস্ট ঘরানার’ বা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। সেই তালিকা প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাসহ প্রশাসনের কর্তা-ব্যক্তিদের হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদেবার্তায় পাঠানো হচ্ছে। এই তালিকায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী নয় এবং পেশাদার ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের নামও ঢুকিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব তালিকাভুক্তদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়েও একটি দল তৎপর রয়েছে। এসব ঘটনায় পুলিশ বাহিনীর ভেতরে নতুন করে অনিশ্চয়তা বা শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে- গত দুদিন ধরে পুলিশের বিসিএস ১৫তম, ১৭তম এবং ১৮তম ব্যাচের ২৫ কর্মকর্তার নামসংবলিত তালিকাগুলো ঘুরছে এক হোয়াটসঅ্যাপ থেকে আরেক হোয়াটসঅ্যাপে। যেখানে জাতীয়তাবাদী ঘরানার হিসেবে পরিচিত কয়েকজন কর্মকর্তার নামও রয়েছে। অর্থাৎ তালিকা তৈরির পেছনে প্রকৃত রাজনৈতিক বিবেচনার চেয়ে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব বা পদ-পদবির প্রতিযোগিতাই বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা দেখছি কিছু কর্মকর্তা বিভিন্ন ব্যাচের নাম দিয়ে আলাদা আলাদা তালিকা বানাচ্ছেন। এতে রাজনৈতিক ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে যাদের নাম দেওয়া হয়েছে তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে নিরপেক্ষভাবে কাজ করেছেন। তার মতে, এ ধরনের তালিকা তৈরি হলে বাহিনীর মধ্যে সন্দেহ ও বিভাজন তৈরি হয়। এতে পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, যেসব কর্মকর্তা বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি অনুগত হয়ে কাজ করেছিলেন, তাদের মধ্যেই কেউ কেউ এখন অবস্থান পাল্টে সক্রিয় হয়েছেন। এই চক্রের লক্ষ্য মূলত নতুন ক্ষমতার কাঠামোর কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্য করে তোলা। ফলে তারা অতীতের নানা কর্মকাণ্ড আড়াল করতে অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার পথ বেছে নিয়েছেন।
পুলিশ প্রশাসনের একজন মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তা বলেন, যারা অতীতে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন, এখন তারা নিজেদের অবস্থান বাঁচাতে অন্যদের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। এতে বাহিনীর ভেতরে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।

এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে- এদের মধ্যে কয়েকজন কর্মকর্তা অতীতে দুর্নীতি বা বিতর্কের কারণে পদোন্নতি পাননি। সেই ক্ষোভ থেকেও তারা নতুন পরিস্থিতিতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন।
পুলিশের একজন ডিআইজি গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি পদোন্নতি পেলেও কখনও জেলার পুলিশ সুপার, রেঞ্জ ডিআইজি কিংবা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন হননি। শুধু পদোন্নতি পেয়েছেন। তাকেও এই তালিতায় রাখা হয়েছে।
সূত্র বলেছে, পুলিশের দুটি ব্যাচের কর্মকর্তা এই রাজনৈতিক তালিকা তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। একটি গোয়েন্দা সংস্থা সামগ্রিক বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে। এ বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে তারা প্রতিবেদন দাখিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।