জি এম রফিক:
প্র্যাচের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর শিক্ষাজীবন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা ছিল। সম্প্রতি ঢাবি ক্যাম্পাসে এক অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পর সেই আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। একই সময়ে ভাইরাল হয়েছে তার ভর্তি-সংক্রান্ত একটি পুরোনো স্মৃতিচারণ, যেখানে দাবি করা হয়েছে—ঢাবিতে ভর্তি হতে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া কাগজপত্র এক শিক্ষক নিজ হাতে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তারেক রহমানকে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র, সাবেক সহপাঠীদের তথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল পোস্ট এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৯৮৫-৮৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাবির আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন তারেক রহমান। পরে তিনি বিভাগ পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন।
ক্যাম্পাসের বড় ভাই, ক্যাম্পাসে স্বাগতম:
``ক্যাম্পাসের বড় ভাই” স্লোগানে মুখর ঢাবি সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেন তারেক রহমান। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি অংশের স্লোগান ছিল—“ক্যাম্পাসের বড় ভাই, ক্যাম্পাসে স্বাগতম”। এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন ওঠে—ঢাবিতে তারেক রহমানের ছাত্রজীবনের প্রকৃত ইতিহাস কী?
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ভবনের পুরোনো তথ্য পর্যালোচনায় জানা গেছে, তিনি প্রথমে আইন বিভাগে ভর্তি হন। তবে মাত্র দুই মাস ক্লাস করার পর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে স্থানান্তরিত হন। এছাড়া তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের (এসএম হল) আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন বলেও তথ্য মিলেছে।
সহপাঠীদের তালিকায় পরিচিত অনেক মুখ বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে পাওয়া তথ্যমতে, আইন বিভাগে তারেক রহমানের সহপাঠী ছিলেন ৭৭ জন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ৪৫ জন। সহপাঠীদের তালিকায় দেশের বিচার বিভাগ, রাজনীতি ও প্রশাসনের একাধিক পরিচিত ব্যক্তির নাম রয়েছে।
আইন বিভাগের সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, পরিবেশ বিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং আপিল বিভাগের বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
ঢাবির সাবেক শিক্ষক আসিফ নজরুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে উল্লেখ করেন, এরশাদ সরকারের সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণেই সম্ভবত তারেক রহমানের নিয়মিত শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়।
ভাইরাল ফেসবুক পোস্টে নতুন আলোচনার জন্ম:
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক পোস্টে নোয়াখালীর হাতিয়া কলেজের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহ ওয়ালী উল্লাহ দাবি করেন, ১৯৮৬ সালের জুন মাসে ঢাবির কলাভবনের নিচে ভর্তি সাক্ষাৎকারের সময় তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র কুড়িয়ে পান।
তার ভাষ্যমতে, কাগজপত্রে তারেক রহমান নাম এবং অভিভাবকের স্থানে জিয়াউর রহমান-এর নাম লেখা ছিল। কিছুক্ষণ পর এক তরুণকে উদ্বিগ্নভাবে ফাইল খুঁজতে দেখে তিনি কাগজপত্রগুলো ফিরিয়ে দেন। পরে চেহারার সঙ্গে মিল খুঁজে বুঝতে পারেন, ওই তরুণই ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর ছেলে তারেক রহমান।
তিনি আরও দাবি করেন, সে সময় ঢাবি ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি, মিছিল, সংঘর্ষ ও সহিংসতা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। এমন পরিস্থিতিতে একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির পরিবারের সদস্যের জন্য স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়া কঠিন ছিল।
ভর্তি হয়েছিল, কিন্তু ডিগ্রি সম্পন্ন?
স্মৃতিচারণে শাহ ওয়ালী উল্লাহ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন— তারেক জিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল, কিন্তু অনার্স শেষ করেছে কিনা জানা নেই।”
ঢাবির রেজিস্ট্রার ভবনের তথ্য অনুযায়ী, যারা একাডেমিক কার্যক্রম সম্পন্ন করে সনদ গ্রহণ করেন, সাধারণত তাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষিত থাকে। তবে তারেক রহমানের ক্ষেত্রে বিভাগ পরিবর্তন ও অসম্পূর্ণ শিক্ষাজীবনের কারণে পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক রেকর্ড নিয়ে এখনও নানা প্রশ্ন ও আলোচনা রয়েছে।
রাজনৈতিক বাস্তবতায় অতীতের স্মৃতি:
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমানকে ঘিরে অতীতের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণও ব্যাপক আগ্রহের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে তার শিক্ষাজীবন, ছাত্ররাজনীতি ও নিরাপত্তাজনিত প্রেক্ষাপট নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক থাকায় সাম্প্রতিক এই তথ্য ও স্মৃতিচারণ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে প্রভাতী খবরের অনুসন্ধান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংরক্ষিত তথ্য ও সমসাময়িক ব্যক্তিদের বক্তব্য মিলিয়ে বিষয়টি নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।