ধর্ম ও শিক্ষা

হজের বিশেষ ১০ ফজিলত

হজের বিশেষ ১০ ফজিলত

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ

হজ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম এক মহান ইবাদত, যা একজন মুমিনের জীবনে ঈমান, ত্যাগ, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে লাখো মুসলমান যখন একত্রিত হয়ে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত করে তোলে পবিত্র ভূমিকে, তখন সৃষ্টি হয় এক অপূর্ব ঈমানি পরিবেশ।

হজ শুধু শারীরিক সফর নয়; বরং এটি গুনাহ থেকে পবিত্র হয়ে নতুন জীবনে ফিরে আসার এক মহাসুযোগ। তাই ইসলাম হজের জন্য ঘোষণা করেছে অসীম প্রতিদান ও মর্যাদা। সেগুলো হলো :

১. হজ পূর্ববর্তী সব গুনাহ মুছে দেয় : আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করে বলেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হজ করে আর তাতে কোনো ধরনের অশ্লীল ও অন্যায় আচরণ করে না, তাহলে তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং : ৮১১)

অন্য বর্ণনায় ইরশাদ হয়েছে, আবু হুরায়রা রা. বলেন, আমি মহানবী (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশে হজ করল এবং অশ্লীল কথাবার্তা ও গুনাহ থেকে বিরত থাকল সে ঐ দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে হজ থেকে ফিরে আসবে যেদিন মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ট হয়েছিল।

’(সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ১৫২১)

২. হজে মাবরুরের প্রতিদান হলো জান্নাত : আবু হুরায়রা (রা.)-থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘এক উমরা আরেক উমরা পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহর ক্ষতিপূরণ হয়ে যায়। আর হজে মাবরুরের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।’(সহিহ বুখারী, হাদিস নং : ১৭৭৩)

অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)  বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা হজ ও ওমরা পরপর একত্রে পালন কর। কেননা এ দুটি (হজ ও ওমরা) দারিদ্র ও গুনাহসমূহ এমনভাবে দূর করে দেয় যেমন কামারের হাপর লোহা ও সোনা-রুপার ময়লা দূর করে দেয়।

আর হজে মাবরুরের বিনিময় জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।’(সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৮১০)

 ৩. সর্বোত্তম আমল হজে মাবরুর : আবু হুরায়রা (রা.)-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, সর্বোত্তম আমল কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনা। জিজ্ঞাসা করা হলো, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা। জিজ্ঞাসা করা হলো, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, হজে মাবরুর বা কবুল হজ।’(সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ২৬)

মায়িজ (রা.)-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হল, কোন আমল সর্বোত্তাম? তিনি বললেন, এক আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনা।

তারপর জিহাদ করা। অতপর কবুল হজ অন্যান্য আমল থেকে এত উৎকৃষ্ট ও মর্যাদাপূর্ণ যেমন সূর্যের উদয়াচল হতে অস্তাচলের ব্যবধান।’(মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং : ১৯০১০)

৪. নারী, বৃদ্ধ, দুর্বল ব্যক্তি ও শিশুদের জিহাদ হলো হজ ও ওমরা : উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা তো জিহাদকে সর্বোত্তম আমল মনে করি। আমরা কি জিহাদ করব না? তিনি বললেন, না। বরং তোমাদের নারীদের জন্য সর্বোত্তম জিহাদ হল হজে মাবরুর।(সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ১৫২০)

আরেক বর্ণনায় এসেছে, আয়েশা (রা.) বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা কি আপনাদের সাথে জিহাদ করব না? তিনি বললেন, তোমাদের জন্য সবচেয়ে সুন্দর ও উত্তম জিহাদ হলো হজে মাবরুর। আয়েশা রা. বলেন, মহানবী (সা.) থেকে এ কথা শুনার পর থেকে আমি হজ ছাড়িনি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৬১)

৫. হজ ও ওমরাকারীর দোয়া কবুল করা হয় : জাবির (রা.) বর্ণনা করে বলেন, মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, হজ ও ওমরাকারীরা আল্লাহর প্রতিনিধি দল। তারা দোয়া করলে তাদের দোয়া কবুল করা হয় এবং তারা কিছু চাইলে তাদের তা দেওয়া হয়।’ (মুসনদে বাজজার, হাদিস : ১১৫৩)

অন্য বর্ণনায় ইবনে ওমর (রা.)-থেকে ইরশাদ হয়েছে, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী (গাজি), হজ ও ওমরা আদায়কারীরা আল্লাহর প্রতিনিধি দল। তারা দোয়া করলে দোয়া কবুল করা হয় এবং তারা কিছু চাইলে তাদের তা দেওয়া হয়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং : ২৮৯৩)

৬. হাজিদের গুনাহ মাফ হয় এবং তারা যাদের গুনাহ ক্ষমা চায় তাদেরও মাফ করা হয় : আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা হাজিদের গুনাহ ক্ষমা করেন এবং হাজিরা যাদের জন্য ক্ষমা প্রর্থনা করেন, তাদেরও ক্ষমা করেন।’ (মুসনাদে বাজজার, হাদিস : ১১৫৫)

৭. হজ ও ওমরার জন্য খরচের ফজিলত : আয়েশা (রা.)-থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) ওমরা করার সময় তাকে তার ওমরা সম্পর্কে বলেছেন, তুমি তোমার পরিশ্রম ও খরচ অনুপাতে নেকি পাবে।’ (মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস : ১৭৭৬)

৮. হজ ও ওমরা পালনকালে মৃত্যুবরণের ফজিলত : ইবনে আববাস (রা.)-থেকে বর্ণিত, ‘এক ব্যক্তি আরাফার ময়দানে মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে উকুফরত ছিলেন। হঠাৎ তিনি বাহন থেকে নিচে পড়ে যান। এতে তার ঘাড় মটকে যায় এবং তিনি মারা যান। তখন মহানবী (সা.) বলেন, তাকে বড়ইপাতা সিদ্ধকরা পানি দিয়ে গোসল দাও, তার দুই কাপড় দিয়ে তাকে কাফন পরাও। তাকে সুগন্ধি লাগিও না এবং তার মাথাও আবৃত কোরো না। কেননা তাকে কিয়ামতের দিন তালবিয়া পাঠরত অবস্থায় উঠানো হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ১২৬৭)

৯. তালবিয়া পাঠের ফজিলত : আবু বকর (রা.)-থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন হজ সর্বোত্তম? তিনি বললেন, যে হজে উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ করা হয় এবং কোরবানি করা হয়। (-সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৮২৭) 

অন্য বর্ণনায় ইরশাদ হয়েছে, সাহল ইবনে সাদ রা. বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে কোনো মুসলমান তালবিয়া পাঠ করল, তার তালবিয়া পাঠের অনুসরণে তার ডান ও বামের বৃক্ষরাজি সবকিছুই তার সঙ্গে তালবিয়া পাঠ করে, যতক্ষণ না জমিন তার এদিক তথা ডান ও বাম পার্শ্ব হতে ধ্বংস হয়ে যায়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৮২৮)

১০. বাইতুল্লাহ তাওয়াফের ফজিলত : ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি মহানবী (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি যথাযথভাবে সাতবার বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করে এবং দুই রাকাত সালাত আদায় করে তার একটি গোলাম আজাদ করার সমান সওয়াব হয়। তাওয়াফের প্রতি কদমে আল্লাহ তার একটি করে গুনাহ মাফ করেন, একটি করে নেকি লেখেন এবং দশটি মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং : ৪৪৬২)

অতএব, হজের প্রতিদান শুধু কিছু সওয়াবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একজন মুমিনের জীবনকে আমূল পরিবর্তন করে দেওয়ার এক মহান ইবাদত। তাই হজকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও আত্মশুদ্ধির এক মহাসুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।