আইন ও আদালত

ঔপনিবেশিক দণ্ডবিধি বনাম আধুনিক বাংলাদেশ: ১৮৬০ সালের আইনে কতটা চলছে ২০২৬-এর বিচারব্যবস্থা

ঔপনিবেশিক দণ্ডবিধি বনাম আধুনিক বাংলাদেশ: ১৮৬০ সালের আইনে কতটা চলছে ২০২৬-এর বিচারব্যবস্থা

আদালত প্রতিবেদক:

বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মূল ভিত্তি এখনো ব্রিটিশ শাসকদের প্রণীত ১৮৬০ সালের “দণ্ডবিধি বা পেনাল কোড। প্রায় ১৬৬ বছর আগে উপমহাদেশ শাসনের সুবিধার্থে প্রণীত এই আইন দিয়েই আজও হত্যা, ধর্ষণ, চুরি, প্রতারণা, রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ থেকে শুরু করে অসংখ্য মামলার বিচার পরিচালিত হচ্ছে। অথচ প্রযুক্তি, সমাজব্যবস্থা, অপরাধের ধরন এবং মানবাধিকার ধারণাসবকিছু পাল্টে গেলেও আইনটির বড় অংশ রয়ে গেছে ঔপনিবেশিক কাঠামোতেই। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী মনিয়ারা খানম। তাঁর ভাষায়, “১৮৬০ সালের আইন দিয়ে ২০২৬ সালের সমাজকে বিচার করা কতটা যৌক্তিক, সেটি এখন জাতীয়ভাবে ভাবার সময় এসেছে।

১৮৬০ সালের “Penal Code” মূলত ব্রিটিশদের উপনিবেশিক প্রশাসন টিকিয়ে রাখতে তৈরি হয়েছিল। লর্ড ম্যাকলের নেতৃত্বাধীন কমিশনের খসড়া অনুযায়ী এই আইন কার্যকর হয় ১৮৬২ সালে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও সেই একই আইনের বড় অংশ বহাল থাকে। বর্তমানে এই দণ্ডবিধির ওপর নির্ভর করেই দেশের অধিকাংশ ফৌজদারি বিচার পরিচালিত হচ্ছে।

আইনজীবী মনিয়ারা খানম বলেন, এই আইনের মূল দর্শন ছিল “শাসন ও নিয়ন্ত্রণ, “নাগরিক অধিকার রক্ষা নয়। ফলে বহু ধারায় এখনো ঔপনিবেশিক মানসিকতার ছাপ স্পষ্ট। বিশেষ করে রাষ্ট্রদ্রোহ, মানহানি, জনশৃঙ্খলা কিংবা “রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ধরনের অপরাধের ভাষা অত্যন্ত বিস্তৃত ও ব্যাখ্যাভিত্তিক। মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, এসব ধারা কখনো কখনো মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়।

আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠছে সাইবার অপরাধ, ডিজিটাল জালিয়াতি, অনলাইন হয়রানি কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট অপরাধ নিয়ে। ১৮৬০ সালের আইন যখন প্রণীত হয়েছিল, তখন বিদ্যুৎও সাধারণ মানুষের কাছে ছিল না। অথচ আজকের বাংলাদেশে অপরাধের বড় একটি অংশ সংঘটিত হচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যমে। ফলে পুরোনো ধারার সঙ্গে নতুন বাস্তবতার সংঘাত তৈরি হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

তিনি বলেন, ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন ও নারী সহিংসতার মতো অপরাধের ক্ষেত্রেও অনেক বিধান আধুনিক মানবাধিকার কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যদিও পরবর্তীতে বিভিন্ন বিশেষ আইন যুক্ত হয়েছে, তবুও মূল ফৌজদারি কাঠামো এখনো ব্রিটিশ যুগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

এই আইনজীবীর মতে, বিচ্ছিন্ন সংশোধন নয়পুরো ফৌজদারি আইন ব্যবস্থার সমন্বিত সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার আরেকটি বড় সংকট হলো মামলার দীর্ঘসূত্রতা। ঔপনিবেশিক আমলের বিচার কাঠামো, সাক্ষ্য আইন, তদন্ত পদ্ধতি এবং বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো বহুলাংশে পুরোনো ধ্যানধারণার ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আদালত অনেক সময় কার্যকর সমন্বয় করতে পারে না।

বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে তাদের ঔপনিবেশিক আইনব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করেছে। ভারত নতুন তিনটি ফৌজদারি আইন কার্যকর করেছে। পাকিস্তানও বিভিন্ন ধারা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো সামগ্রিক সংস্কারের উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। আইনজীবী মনিয়ারা খানম মনে করেন, আইন শুধু শাস্তি দেওয়ার যন্ত্র নয়; এটি নাগরিকের ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা। তাই আইনকে সময়োপযোগী না করলে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাবে।

তবে আইনজীবী মনিয়ারা খানম এটিও মনে করেন যে, পুরোনো হলেও এই দণ্ডবিধির কিছু মৌলিক কাঠামো এখনো কার্যকর। কারণ দীর্ঘদিন ধরে বিচারক, আইনজীবী ও তদন্ত সংস্থাগুলো এই কাঠামোর সঙ্গে অভ্যস্ত। হঠাৎ পুরো আইন বদলে ফেললে বিচারব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তাই তার মতে ধাপে ধাপে সংস্কারই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।

প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কি এখনো ব্রিটিশ আমলের শাসনকেন্দ্রিক আইনের ওপর নির্ভর করবে, নাকি নাগরিক অধিকার, প্রযুক্তি ও আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন দণ্ডবিধির দিকে এগোবে? এই বিতর্ক এখন কেবল আইন অঙ্গনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি হয়ে উঠছে রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক অধিকারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- সালমান ইসলাম