সম্পর্কের সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছে বুদ্ধিমত্তার প্রতি আকর্ষণ
জিএম রফিক:
একসময় প্রেম-ভালোবাসার ক্ষেত্রে সৌন্দর্য, অর্থনৈতিক অবস্থান কিংবা সামাজিক মর্যাদাকেই সবচেয়ে বড় বিবেচনা করা হতো। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সমাজে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে সম্পর্কের মানদণ্ড। এখন অনেক তরুণ-তরুণীর কাছে বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও গভীর চিন্তাশক্তি। এই নতুন মানসিক ও সামাজিক প্রবণতার নাম—‘স্যাপিওসেক্সুয়াল’।
বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ডেটিং অ্যাপ ও মনোবিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনায় শব্দটি এখন বহুল আলোচিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক সম্পর্কের ধারণায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।
কী এই স্যাপিওসেক্সুয়াল?
“স্যাপিওসেক্সুয়াল” শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ Sapien থেকে, যার অর্থ জ্ঞানী বা বুদ্ধিমান। সাধারণভাবে স্যাপিওসেক্সুয়াল বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যিনি অন্যের শারীরিক সৌন্দর্যের চেয়ে তার বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান, যুক্তি ও চিন্তার গভীরতার প্রতি বেশি রোমান্টিক বা মানসিকভাবে আকৃষ্ট হন।
মার্কিন অভিধান প্রতিষ্ঠান merriam-webster.com স্যাপিওসেক্সুয়াল শব্দের অর্থ দিয়েছে—“যে ব্যক্তি উচ্চ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন মানুষের প্রতি যৌন বা রোমান্টিক আকর্ষণ অনুভব করে।”
বিশ্বখ্যাত স্বাস্থ্যবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম webmd.com জানিয়েছে, স্যাপিওসেক্সুয়াল ব্যক্তিদের কাছে বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনা, নতুন কিছু শেখার মানসিকতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং গভীর কথোপকথনই সম্পর্কের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক।
কেন বাড়ছে এই প্রবণতা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল যুগে মানুষের যোগাযোগ ও সম্পর্কের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে সম্পর্কের শুরু হতো পরিবার, প্রতিবেশ বা সামাজিক পরিমণ্ডলে, এখন তা অনেকাংশে নির্ভর করছে অনলাইন যোগাযোগ, মতাদর্শ ও মানসিক সংযোগের ওপর।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে আবেগীয় নিরাপত্তা, মানসিক সামঞ্জস্য ও চিন্তার মিলকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, একজন মানুষের জ্ঞান, ব্যক্তিত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গিও সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী, গবেষক, প্রযুক্তিখাতের কর্মী এবং জ্ঞানভিত্তিক পেশাজীবীদের মধ্যে এই প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে।
ডেটিং অ্যাপেও জনপ্রিয়তা
বিশ্বের জনপ্রিয় কয়েকটি ডেটিং অ্যাপে “Sapiosexual” এখন আলাদা পরিচয় বা পছন্দ হিসেবে যুক্ত হয়েছে। ব্যবহারকারীরা নিজেদের প্রোফাইলে উল্লেখ করছেন যে তারা বুদ্ধিদীপ্ত ও চিন্তাশীল মানুষকে বেশি পছন্দ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘসময় কাটানো এবং তথ্যভিত্তিক আলোচনার সংস্কৃতি তরুণদের মধ্যে মানসিক সংযোগের চাহিদা বাড়িয়েছে। ফলে “ভালো কথা বলতে পারে”, “বই পড়ে”, “বিশ্ব নিয়ে ভাবে”—এ ধরনের বৈশিষ্ট্য এখন অনেকের কাছে আকর্ষণের বড় কারণ।
বিতর্কও কম নয়
তবে স্যাপিওসেক্সুয়ালিটি নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। অনেক মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানী এটিকে পূর্ণাঙ্গ যৌন পরিচয় হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাজি নন। তাদের মতে, এটি মূলত ব্যক্তিগত পছন্দ বা আকর্ষণের একটি ধরন।
সমালোচকদের কেউ কেউ বলছেন, “বুদ্ধিমত্তা” একটি আপেক্ষিক বিষয়। কারো কাছে এক ধরনের জ্ঞান আকর্ষণীয় হলেও অন্যের কাছে তা নাও হতে পারে। আবার অনেকে মনে করেন, এটি কখনো কখনো সামাজিক শ্রেণিবৈষম্য বা “ইন্টেলেকচুয়াল এলিটিজম”-এর ধারণাকেও উৎসাহিত করতে পারে।
তবে সমর্থকদের মতে, সম্পর্কের ক্ষেত্রে শারীরিক আকর্ষণের পাশাপাশি মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংযোগকে গুরুত্ব দেওয়া সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
বাংলাদেশেও বাড়ছে আলোচনা
বাংলাদেশেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “স্যাপিওসেক্সুয়াল” শব্দটির ব্যবহার বাড়ছে। ফেসবুক, টিকটক ও বিভিন্ন অনলাইন ফোরামে তরুণদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা দেখা যাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থী মনে করছেন, বর্তমান সময়ে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে মানসিক বোঝাপড়া ও চিন্তার মিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে “স্মার্ট” বা “ইন্টেলিজেন্ট” ব্যক্তিত্ব এখন সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
ঢাকার কয়েকজন মনোবিজ্ঞানী বলছেন, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এখন মানসিক স্বাস্থ্য, আবেগীয় পরিপক্বতা ও জ্ঞানচর্চা নিয়ে সচেতনতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। সেই পরিবর্তনেরই একটি প্রতিফলন স্যাপিওসেক্সুয়াল প্রবণতা।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বুদ্ধিমত্তা অবশ্যই আকর্ষণীয় একটি গুণ। তবে শুধুমাত্র “জ্ঞান” বা “বুদ্ধিমত্তা” দিয়েই একটি সম্পর্ক টিকে থাকে না। সম্পর্কের জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা, সততা ও আবেগীয় সংযোগ।
তাদের মতে, কোনো মানুষকে কেবল তার আইকিউ বা শিক্ষাগত যোগ্যতা দিয়ে মূল্যায়ন না করে মানবিক গুণাবলিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কোন পথে?
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের সম্পর্কগুলো আরও বেশি “মানসিক সংযোগনির্ভর” হয়ে উঠতে পারে। যেখানে সৌন্দর্যের পাশাপাশি গুরুত্ব পাবে চিন্তার গভীরতা, সৃজনশীলতা, আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া।
স্যাপিওসেক্সুয়াল প্রবণতা সেই পরিবর্তনেরই একটি নতুন সামাজিক প্রতিচ্ছবি—যেখানে প্রেমের ভাষা শুধু চোখে নয়, মেধা ও মননেও খোঁজা হচ্ছে।