হজে অনিয়ম: অর্ধশতাধিক এজেন্সির বিরুদ্ধে নেওয়া হচ্ছে ব্যবস্থা
অনলাইন ডেক্স:
চলতি বছর (২০২৬ সাল) হজ মৌসুমে নানা ধরনের অনিয়ম, প্রতারণা, সৌদি সরকারের নির্দেশনা লঙ্ঘন এবং হজযাত্রীদের হয়রানির অভিযোগে অর্ধশতাধিক হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক এজেন্সিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সৌদি আরব থেকে আসা অভিযোগসহ সব অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে এক মাসের মধ্যেই নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে।
গত ২৬ মে পবিত্র হজ পালিত হয়। এবার বাংলাদেশ থেকে ৭৮ হাজার ৫০০ জন হজ পালন করেন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৪ হাজার ৫৬৫ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৭৩ হাজার ৯৩৫ জন হজ পালন করেন। চলতি বছর হজ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অনুমোদিত এজেন্সির সংখ্যা ছিল ৭৫৮টি। এর মধ্যে অনুমোদিত লিড হজ এজেন্সির সংখ্যা ৩০টি।
এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজযাত্রীরা হজ পালন করেন। প্রতি বছরই এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে নানান অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অনিয়মের ধরন অনুযায়ী ‘হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২১’ ও ‘হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২২’ অনুযায়ী হজ এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল, লাইসেন্স স্থগিত, জামানত বাজেয়াপ্ত ছাড়াও জরিমানার ব্যবস্থা রয়েছে।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হজ অধিশাখার যুগ্ম-সচিব মো. মঞ্জুরুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘চলতি বছর হজে অনিয়ম করায় অনেকগুলো এজেন্সিকে শোকজ করা হয়েছে এবং সৌদি আরব থেকে আসা অভিযোগগুলোও যাচাই-বাছাই করে এক মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। কারণ আমাদের আগামী বছরের হজ কার্যক্রমের যোগ্য এজেন্সির তালিকা চূড়ান্ত করতে হবে।’
মঞ্জুরুল হক বলেন, ‘প্রতারণা করায় আমরা ১৭টি এজেন্সির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছি। পরবর্তীসময়ে এজেন্সির হজ যাত্রীদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে পাঠানো হয়।
এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ নিষ্পত্তির বিষয়ে যুগ্ম-সচিব বলেন, অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি এক মাসের মধ্যেই করার লক্ষ্য রয়েছে। কারণ, এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোর ভবিষ্যৎ কার্যক্রম এবং হজ ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণের বিষয় জড়িত।
তিনি বলেন, দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দিনরাত কাজ করছেন।
কোরবানির অর্থ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি মাথায় রেখেই আগামী বছর থেকে হজ নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নিবন্ধনের সময়ই হাজি কোন ধরনের হজ পালন করবেন, অর্থাৎ তামাত্তু, কিরান নাকি ইফরাদ, তা সিস্টেমে উল্লেখ করতে হবে।
যুগ্ম-সচিব বলেন, এতে আগেই নির্ধারণ করা যাবে কতজন হাজির জন্য কোরবানি বাধ্যতামূলক হবে এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
মঞ্জুরুল হক বলেন, এ বছর কিছু এজেন্সি কোরবানি সম্পন্ন হওয়ার প্রমাণ হিসেবে ছাগল কেনার রসিদ দেখিয়েছে। কিন্তু সৌদি সরকারের নির্ধারিত নুসুক ব্যবস্থার বাইরে এ ধরনের কোরবানি গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে এ ধরনের ঘটনায় প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সৌদি সরকারের নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ না করলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সমস্যায় পড়তে পারে। তাই হজ ব্যবস্থাপনা আরও সুশৃঙ্খল করতে ধাপে ধাপে পুরো প্রক্রিয়া নির্ধারিত সিস্টেমের আওতায় আনা হচ্ছে।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এবার অভিযুক্ত হজ এজেন্সির সংখ্যা অর্ধশতাধিক হতে পারে। এরমধ্যে অনেক ছোটোখাটো অভিযোগ রয়েছে। এখন আর হজের জন্য যোগ্য এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে আগের মতো বড় কোনো অভিযোগ পাওয়া যায় না। যেগুলো পাওয়া যায় সেগুলো মন্ত্রণালয় খতিয়ে দেখে। লাইসেন্স বাতিল, স্থগিত ও জরিমানা সঙ্গে সঙ্গে কাউকে কাউকে সতর্কও করা হয়।
প্রতারণার অভিযোগে একের পর এক শোকজ
হজযাত্রীদের অন্য এজেন্সিতে স্থানান্তর, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, নিবন্ধন বাতিল, সময়মতো সৌদি আরবে পাঠাতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে ১৭টি হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
এর মধ্যে গ্রিন এভিয়েশন, এয়ার রয়্যাল অ্যাভিয়েশন, নর্দার্ন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, বাপারি এয়ার সার্ভিস ও এয়ার স্টেশন ইন্টারন্যাশনালের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে- কেন প্রাক-নিবন্ধিত হজযাত্রীদের অন্য এজেন্সিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। কোনো কোনো হজযাত্রীর কাছ থেকে ১০ লাখ টাকারও বেশি অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অন্যদিকে ১২টি এজেন্সির বিরুদ্ধে অর্থ নেওয়ার পরও হজে পাঠাতে ব্যর্থ হওয়া, নিবন্ধন বাতিল এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অনেক হজযাত্রীর অর্থ সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোর কাছ থেকে আদায় করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় তাদের হজ সম্পন্ন করানো হয়েছে।
মীর আমেনা ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস লাইসেন্স বাতিল হওয়ার পরও অন্য তিনটি এজেন্সির মাধ্যমে হজযাত্রী পাঠানোর নামে অর্থ গ্রহণ করে। পরে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে প্রায় ৪৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা আদায় করে ওই হজযাত্রীদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ সম্পন্ন করানো হয়। নর্দার্ন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস লিমিটেড পাঁচজন হজযাত্রীর নিবন্ধন বাতিল করায় তাদের জমা দেওয়া ২০ লাখ টাকা এজেন্সিটির কাছ থেকে আদায় করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ সম্পন্ন করানো হয়। একইভাবে রিলেশন ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরস একজন হজযাত্রীর নিবন্ধন বাতিল করায় প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকা আদায় করে ওই হজযাত্রীর সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ সম্পন্ন করা হয়।
এছাড়া আনসারি ওভারসিজ দুজন হজযাত্রীকে সময়মতো সৌদি আরবে পাঠাতে ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থ দাবি করে। পরে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ১৬ লাখ টাকা আদায় করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় তাদের হজ সম্পন্ন করানো হয়। এক্স এম ট্রাভেলস, দারুল ইহসান ট্রাভেলস, বাপারী এয়ার সার্ভিস, জিবার্ট ট্রাভেলস লিমিটেড, থাসিন ট্রাভেলস, এয়ার স্টেশন ইন্টারন্যাশনাল এবং তিস্তা এয়ার ট্রাভেলসের বিরুদ্ধেও হজযাত্রীদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের পর নিবন্ধন বাতিল, অতিরিক্ত অর্থ আদায় অথবা নির্ধারিত সময়ে হজে পাঠাতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ আদায় করে ক্ষতিগ্রস্ত হজযাত্রীদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ সম্পন্ন করানো হয়েছে।
নিবন্ধনের শর্ত পূরণ করেনি অনেক এজেন্সি
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যোগ্য তালিকায় নাম থাকার পরও গত তিন বছর ৪০ জনের কম হজযাত্রী নিবন্ধন এবং চলতি বছর (২০২৬) হজে কোনো হজযাত্রী নিবন্ধন না করতে পারা এজেন্সিগুলো আগামী বছরের হজে অংশ নিতে পারবে না।
সুষ্ঠু হজ ব্যবস্থাপনার স্বার্থে এসব এজেন্সিকে এক বছরের জন্য হজ কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
কোরবানিতে অনিয়ম
নুসুক মাসার সিস্টেমের বাইরে কোরবানি সম্পন্নের অভিযোগে পাঁচটি হজ এজেন্সিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এজেন্সিগুলো হলো-প্রত্যাশা ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস, দৈফুর রহমান ট্রাভেলস, গ্লোবাল ট্রাভেলস সার্ভিস অ্যান্ড ট্যুরস, মিডিয়া ট্রাভেলস সার্ভিস লিমিটেড এবং দারুল ইমান ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস।
মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, হাজিদের কাছ থেকে কোরবানির অর্থ নেওয়া হলেও নুসুক মাসার মাধ্যমে কোরবানি সম্পন্নের প্রমাণ দিতে পারেনি এসব এজেন্সি। কারও ক্ষেত্রে কোনো তথ্য জমা দেওয়া হয়নি, আবার কারও ক্ষেত্রে জমা দেওয়া তথ্য পর্যালোচনায় অনিয়ম ধরা পড়ে। সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না মিললে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এছাড়া নুসুক মাসার বাইরে কোরবানি সম্পন্নের অঙ্গীকার করায় সিদ্দিকীয়া হজ ট্রাভেলস, ঢাকা এয়ার এভিয়েশন সার্ভিস ও জীবন ট্রাভেলস লিমিটেডকেও পৃথকভাবে শোকজ করা হয়েছে।
আরও নানা অনিয়ম
হাজিদের হারানো লাগেজ উদ্ধারে অসহযোগিতা, নিম্নমানের খাবার পরিবেশন এবং প্রতিশ্রুত সেবা না দেওয়ার অভিযোগে লাকি ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরিজমকে শোকজ করা হয়।
সরকার অনুমোদিত এয়ারলাইন্সের বাইরে বিদেশি এয়ারলাইন্সে হজযাত্রী পাঠানোর পরিকল্পনার অভিযোগে মিডিয়া ট্রাভেল সার্ভিসেস লিমিটেডের কাছে ব্যাখ্যা চায় মন্ত্রণালয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এছাড়া বাড়িভাড়া, ভিসা, নুসুক মাসার সিস্টেমে তথ্য এন্ট্রি, পরিবহন চুক্তিতে ব্যর্থতা, হজযাত্রী পরিবর্তন এবং নিবন্ধন বাতিলসহ একাধিক অনিয়মের অভিযোগে খোয়াই এয়ার ট্রাভেলসের ২০২৭ ও ২০২৮ সালের সব ধরনের হজ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
# জাগোনিউজ এর সৌজন্যে