২০০ কিমি বেগে ধেয়ে আসছে ‘বাভি’, সর্বোচ্চ সতর্কতায় দুই দেশ
ঘণ্টায় প্রায় ২০০ কিলোমিটার বেগের বাতাস নিয়ে শক্তিশালী টাইফুন বাভি দ্রুত চীন ও তাইওয়ানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা, ১৯৮৭ সালের পর আয়তনের দিক থেকে এটিই হতে পারে সবচেয়ে বড় টাইফুন। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় তাইওয়ান ও চীন ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। তাইওয়ানে ২৯ হাজার সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে এবং উপকূলীয় এলাকায় জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টাইফুন বাভি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী ক্রান্তীয় ঝড়গুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে। এমন সময় এটি আঘাত হানার পথে রয়েছে, যখন টাইফুন মায়সাকের ক্ষয়ক্ষতি সামাল দিতে এখনো ব্যস্ত চীনের বিভিন্ন অঞ্চল।
তাইওয়ানের কেন্দ্রীয় আবহাওয়া প্রশাসন জানিয়েছে, রাজধানী তাইপের আশপাশের উত্তরাঞ্চলের পার্বত্য এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রায় ২৯ হাজার সেনাকে প্রস্তুত রেখেছে। কর্মকর্তাদের ধারণা, ২০২৪ সালের কং রে টাইফুনের পর এটিই হতে পারে তাইওয়ানে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ঝড়। ওই দুর্যোগে তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছিল।
আবহাওয়াবিদদের মতে, প্রায় এক হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত বাভি ১৯৮৭ সালের পর আয়তনের দিক থেকে তাইওয়ানে আঘাত হানা সবচেয়ে বড় টাইফুনে পরিণত হতে পারে।
চীনের জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্র জানিয়েছে, উত্তর তাইওয়ানের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার পর শনিবার (১১ জুলাই) সন্ধ্যায় টাইফুনটি চীনের পূর্বাঞ্চলের ফুজিয়ান প্রদেশে আঘাত হানতে পারে।
তাইওয়ানের পূর্বাভাস কর্মকর্তা জেসন চ্যাং বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এত বিশাল আকৃতির ঘূর্ণিঝড় খুব কমই দেখা গেছে। তাঁর মতে, ১৯৮৭ সালের পর এ ধরনের বড় টাইফুন আর দেখা যায়নি।
এদিকে চলতি সপ্তাহের শুরুতে টাইফুন মায়সাকের আঘাতে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুয়াংসি এলাকায় অন্তত ৩৯ জন নিহত হয়েছেন। এখনো নয়জন নিখোঁজ রয়েছেন। ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চীন, তাইওয়ান ও জাপান ক্রমেই আরো শক্তিশালী প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে পড়ছে। পাশাপাশি এ বছর এল নিনোর প্রভাব তাপমাত্রা বাড়িয়ে আরো শক্তিশালী ও ঘন ঘন টাইফুন তৈরির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে।
বাণিজ্যিক আবহাওয়া পূর্বাভাস সংস্থা অ্যাকুওয়েদারের বিশেষজ্ঞ জেসন নিকোলস জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) থেকে বাভির বাতাসের গতি কিছুটা কমতে পারে। তবে শুক্রবার (১০ জুলাই) থেকে সোমবার (১৩ জুলাই) পর্যন্ত তাইওয়ান ও পূর্ব চীনে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ঝড় হিসেবেই প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে জাপানের আবহাওয়া সংস্থা ওকিনাওয়া অঞ্চলে প্রবল বাতাস, ভারী বৃষ্টি, ভূমিধস, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কায় শুক্রবার ও শনিবারের জন্য সতর্কতা জারি করেছে।
টাইফুন মায়সাকের ক্ষয়ক্ষতির চিত্রও উদ্বেগজনক। বেইজিং নিউজ জানিয়েছে, গুয়াংসির বিনইয়াং কাউন্টির একটি খামারে টানা দুই দিন পানির নিচে ডুবে থাকার পর বিপুলসংখ্যক শূকরের মৃত্যু হয়েছে।
এ ছাড়া গ্লোবাল টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, গুয়িগাং চিড়িয়াখানায় বন্যার পানিতে তিনটি সিংহ মারা গেছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছে দু’টি জেব্রা, চারটি সজারু, অসংখ্য টিয়া পাখি, উত্তর আমেরিকার দু’টি র্যাকুনসহ প্রায় ১০০টি প্রাণী।
টাইফুনের প্রভাবে জাপান এয়ারলাইন্স শুক্রবার ৪৮টি অভ্যন্তরীণ ও দু’টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করেছে। এতে প্রায় ৭ হাজার ৬১০ যাত্রী ভোগান্তিতে পড়বেন। অল নিপ্পন এয়ারওয়েজও শুক্রবার ৩৪টি এবং শনিবার আরো ৩৩টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে, যা দুই দিনে প্রায় ৭ হাজার ৭০০ যাত্রীর ভ্রমণ পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলবে।
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের ঘূর্ণিঝড় গবেষক শিয়াংবো ফেং বলেন, উন্মুক্ত প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ পানির ওপর দীর্ঘ সময় অবস্থান করায় টাইফুন বাভি বিপুল শক্তি ও আর্দ্রতা সঞ্চয় করেছে। তাঁর সতর্কবার্তা, উপকূলে আঘাত হানার সময় এর গতিপথে সামান্য পরিবর্তনও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।