তিন দিন ডুবন্ত ট্রলার আঁকড়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই
ফিরে এসে আল আমিন বললেন, ‘আমার সহকর্মীরা বেঁচে থাকতে পারে’
বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে টানা তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে জীবিত ফিরে এসেছেন জেলে আল আমিন। ডুবন্ত ট্রলার আঁকড়ে ভেসে থাকার সেই বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি এখন হাসপাতালের শয্যায়। তবে নিজের ফিরে আসার আনন্দের চেয়ে এখনো নিখোঁজ থাকা পাঁচ সহকর্মীর চিন্তাই তাকে বেশি কাঁদাচ্ছে। তার বিশ্বাস, তারা যদি ট্রলার ছেড়ে না গিয়ে থাকেন, তাহলে এখনো জীবিত থাকতে পারেন। আল আমিনের এই বিশ্বাসই নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে নিখোঁজ জেলেদের পরিবারকে।
আল আমিন উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের ইচাদী গ্রামের চান মিয়া হাওলাদারের ছেলে। বুধবার (৮ জুলাই) বিকেলে ভোলার ঢালচর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে ভাসমান অবস্থায় ভোলার একটি মাছ ধরার ট্রলারের জেলেরা তাকে উদ্ধার করেন। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় প্রথমে তাকে চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বৃহস্পতিবার সকালে স্বজনরা স্পিডবোটে করে তাকে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসেন। বর্তমানে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো. ইজাজুল হক এবং উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবী তার চিকিৎসা ও সার্বিক খোঁজখবর নিচ্ছেন।
হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে কাঁপা কণ্ঠে আল আমিন বলেন, আমরা এখনো আশা ছাড়িনি। যদি তারা ট্রলার না ছেড়ে থাকে, তাহলে ওরা এখনো বেঁচে থাকতে পারে। দ্রুত খুঁজলে হয়তো ওদের পাওয়া যাবে।
তিনি জানান, গত ৫ জুলাই রাত প্রায় ১০টার দিকে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে ট্রলারে থাকা ১১ জেলে নিয়ে মাছ ধরছিলেন। হঠাৎ প্রবল ঝড়ো হাওয়া ও উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে ট্রলারটি ডুবে যায়। কেউ সাগরে ছিটকে পড়েন, কেউ ট্রলারের ভেতরে আটকা পড়েন।
আল আমিনের ভাষ্য, দুর্ঘটনার সময় তিনজন ট্রলারের ভেতরে ছিলেন এবং আটজন পানিতে ভেসে ওঠেন। তিনি, আক্কাস ও হারুন ডুবন্ত ট্রলার আঁকড়ে ভেসে ছিলেন। ট্রলারের ভেতরে থাকা তিনজনের মধ্যে দুজন পরে ঢেউয়ের তোড়ে বেরিয়ে এলেও একজন আর বের হতে পারেননি।
টানা তিন দিন তিন রাত ক্ষুধা, তৃষ্ণা আর মৃত্যুভয়ের সঙ্গে লড়াই করেছেন তারা। চারদিকে শুধু অথৈ পানি। ছিল না কোনো খাবার বা বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা। বৃষ্টির পানি মুখে নিয়ে তৃষ্ণা মেটানোর চেষ্টা করেছেন। দিনের প্রখর রোদে শরীর পুড়েছে, আর রাতের অন্ধকারে ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়েছে।
একপর্যায়ে দূরে একটি ডুবোচর দেখতে পেয়ে সেটিকে তীর ভেবে সাঁতরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তারা। কিন্তু কাছে গিয়ে বুঝতে পারেন সেখানে কোনো স্থলভাগ নেই। তখন হারুন ও আক্কাস আবার ডুবন্ত ট্রলারের কাছে ফিরে যান। কিন্তু আল আমিন আর ফিরতে পারেননি। তিনি ডুবোচরের আশপাশে ভেসে থাকতে থাকেন। অবশেষে বুধবার বিকেলে ভোলার একটি মাছ ধরার ট্রলারের জেলেরা তাকে দেখতে পেয়ে উদ্ধার করেন।
আল আমিন প্রশাসনকে জানিয়েছেন, নিখোঁজ জেলেরা যদি ট্রলার ছেড়ে না গিয়ে থাকেন, তাহলে তারা কাউয়ারচরের পশ্চিমে হাসাখালী এলাকার সাগরে থাকতে পারেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই সম্ভাব্য এলাকায় উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে আল আমিন জীবিত ফিরে আসার খবর ছড়িয়ে পড়তেই নিখোঁজ পাঁচ জেলের পরিবারে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। কয়েকদিন ধরে কান্নায় ভেঙে পড়া স্বজনরা এখন প্রতিটি মুহূর্ত কাটাচ্ছেন উৎকণ্ঠা আর প্রার্থনায়। কেউ ঘাটে অপেক্ষা করছেন, কেউ মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে আছেন, আবার কেউ আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছেন প্রিয় মানুষটি যেন জীবিত ফিরে আসেন।
গজালিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর হোসেন খান বলেন, বুধবার চরফ্যাশনের দুলাল মাঝির মাধ্যমে আল আমিন জীবিত উদ্ধারের খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বৃহস্পতিবার সকালে স্পিডবোটে সেখানে যাই। চিকিৎসা শেষে তাকে গলাচিপায় নিয়ে আসা হয়েছে। এখন আমরা চাই, বাকি জেলেদেরও দ্রুত উদ্ধার করা হোক।
গলাচিপা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবী বলেন, আল আমিনের দেওয়া তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার বর্ণনার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সম্ভাব্য এলাকায় যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে। আমরা আশা করছি, নিখোঁজ জেলেদের সন্ধান পাওয়া যাবে। পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া জেলেদের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মো. ইজাজুল হক বলেন, উদ্ধার হওয়া জেলে আল আমিন নিখোঁজদের সম্ভাব্য অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। সেই তথ্য যাচাই করে কোস্ট গার্ড, নৌ-পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ৫ জুলাই রাতে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে বঙ্গোপসাগরে গলাচিপার ১১ জেলেকে নিয়ে একটি মাছ ধরার ট্রলার ডুবে যায়। পরদিন পাঁচ জেলেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তিন দিন পর আল আমিনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন পাঁচ জেলে। তারা হলেন হারুন হাওলাদার, এমাদুল, ফোরকান, সায়েম ও আক্কাস।