নিজস্ব প্রতিবেদক:
হাতুড়ির ঠুকঠাক শব্দ, আগুনের তাপে লাল হয়ে ওঠা ধাতু আর কারিগরের নিপুণ হাত—একসময় ধামরাইয়ের কাঁসা-পিতল শিল্পের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকত কারখানাগুলো। থালা, বাটি, গ্লাস, ঘটি, কলসি থেকে শুরু করে ধর্মীয় সামগ্রী ও নান্দনিক ভাস্কর্য—কাঁসা-পিতলের এসব পণ্য ছিল বাংলার ঘর ও সংস্কৃতির পরিচিত অংশ। সময়ের পরিবর্তনে প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল ও কারখানায় তৈরি সস্তা পণ্যের বিস্তারে সেই চাহিদা কমেছে। তার সঙ্গে বেড়েছে কাঁচামালের দাম, উৎপাদন ব্যয় ও বিদ্যুৎ-জ্বালানির সংকট। ফলে ধামরাইসহ দেশের ঐতিহ্যবাহী কাঁসাশিল্প এখন টিকে থাকার কঠিন লড়াইয়ে।
ঢাকার ধামরাইকে বাংলাদেশের কাঁসা-পিতল শিল্পের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সরকারি ঐতিহ্য-তথ্যভাণ্ডারেও ধামরাইয়ের তামা-কাঁসা শিল্পকে স্বতন্ত্র ঐতিহ্য হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। এখানে কাঁসা ও তামার কাজের পাশাপাশি মোমের ছাঁচ ব্যবহার করে বিভিন্ন মূর্তি, পূজার সামগ্রী, তৈজসপত্র ও ঘর সাজানোর সামগ্রী তৈরির ঐতিহ্য রয়েছে।
একসময় ধামরাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য কারখানায় কাঁসা-পিতলের পণ্য তৈরি হতো। বর্তমানে সেই কর্মচাঞ্চল্য অনেকটাই স্তিমিত। ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ধামরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী কাঁসা-পিতল শিল্প এখন গুটিকয়েক কারখানা ও বয়স্ক কারিগরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বহু পরিবার, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই পেশায় ছিল, তাদের পরবর্তী প্রজন্ম অন্য পেশায় চলে গেছে।
ধামরাইয়ের শিমুলিয়া এলাকার কাঁসাশিল্পী আবু তালেবের অভিজ্ঞতাই এ সংকটের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। ৫৭ বছর বয়সী এই কারিগর জানান, তাঁর ভাই, বাবা ও দাদারাও এই পেশায় ছিলেন। কিন্তু পরিবারের অন্য সদস্যরা এরই মধ্যে পেশা পরিবর্তন করেছেন; তিনি একাই এখনো ঐতিহ্যটি ধরে রেখেছেন। অর্থাৎ শুধু কারখানা কমছে না, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে দক্ষতা হস্তান্তরের ধারাটিও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
কাঁসার পণ্য তৈরির কাজও সহজ নয়। ধাতু উত্তপ্ত করা, ভেঙে প্রাথমিক আকার দেওয়া, ছাঁচে ফেলা এবং পরে হাতুড়ির আঘাতে প্রয়োজনীয় আকৃতি তৈরি করা—প্রতিটি ধাপেই দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। ধামরাইয়ের কারিগরেরা থালা, বাটি, পেয়ালা, ঘণ্টা, করতাল ও বিভিন্ন ধর্মীয় সামগ্রীসহ নানা ধরনের পণ্য তৈরি করেন। কোনো কোনো পণ্য ব্যবসায়ীর চাহিদা অনুযায়ী নকশা করে তৈরি করা হয়।
কিন্তু এই শ্রমনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি কারিগরের আয়। ২০২৬ সালের মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে কারিগরদের একজন জানিয়েছেন, তাঁর দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা হলেও সেই অর্থে সংসার চালানো কঠিন। আরেক কারিগর বলেছেন, নিয়মিত কাজই এখন আর পাওয়া যায় না। ফলে দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও পেশাটিকে ভবিষ্যতের নিরাপদ জীবিকার পথ হিসেবে দেখছেন না নতুন প্রজন্ম।
কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি সংকটকে আরও তীব্র করেছে। সংশ্লিষ্ট কারিগরদের হিসাবে, একসময় প্রতি কেজি তামার দাম ছিল প্রায় ১৬০ টাকা; বর্তমানে মানভেদে তা প্রায় ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। টিনের সরবরাহ ও দাম নিয়েও সমস্যা রয়েছে। ফলে নতুন কাঁচামাল কেনার পরিবর্তে পুরোনো কাঁসা ও পিতলের সামগ্রী সংগ্রহ করে পুনর্ব্যবহার করেই অনেক সময় উৎপাদন চালাতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটও কারখানার উৎপাদন ব্যাহত করছে। বিদ্যুৎ না থাকলে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর থাকলেও জ্বালানি সংগ্রহ করা কঠিন ও ব্যয়বহুল হওয়ায় নিয়মিত উৎপাদন ধরে রাখা সম্ভব হয় না। ফলে কাঁচামালের উচ্চমূল্যের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে উৎপাদন বন্ধ থাকার আর্থিক ক্ষতি।
চাহিদার ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন এসেছে। একসময় কাঁসা-পিতলের থালা, বাটি, গ্লাস, ঘটি ও অন্যান্য তৈজসপত্র ছিল বাঙালির দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এখন স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিকের সহজলভ্য ও তুলনামূলক কম দামের পণ্য সেই জায়গা দখল করেছে। ফলে কাঁসার ব্যবহার অনেকাংশে বিশেষ অনুষ্ঠান, ধর্মীয় প্রয়োজন, ঐতিহ্যবাহী পণ্য সংগ্রহ এবং নির্দিষ্ট ক্রেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
তবে বাজার পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। ধামরাইয়ের কারিগরের তৈরি পণ্য ঢাকার মিটফোর্ড এলাকার পাইকারি বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে যায় এবং সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। ঘণ্টা, করতাল ও ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত কিছু পণ্যেরও নির্দিষ্ট বাজার রয়েছে। অর্থাৎ চাহিদা শেষ হয়ে যায়নি; বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহার থেকে এটি অনেকটাই বিশেষায়িত ও সীমিত বাজারে চলে গেছে।
শিল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ধামরাইয়ের মোমের ছাঁচনির্ভর ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প। সরকারি ঐতিহ্য-নথিতে এই শিল্পের সঙ্গে ‘লস্ট ওয়াক্স’ বা মোমের ছাঁচ পদ্ধতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে মোমের মডেলের ওপর বিভিন্ন স্তরে উপাদান প্রয়োগ করে ছাঁচ তৈরি করা হয় এবং পরে সেই ছাঁচে গলিত ধাতু ঢেলে শিল্পকর্ম তৈরি করা হয়। মূর্তি, পূজার উপকরণ, প্রদীপ, ফুলদানি ও বিভিন্ন অলংকারমূলক সামগ্রী তৈরিতে এ ঐতিহ্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, কারিগর সংকটও এখন বড় হুমকি। কাঁসার কাজ শিখতে দীর্ঘ সময় লাগে। নতুন প্রজন্ম যদি এ পেশায় যুক্ত না হয়, তাহলে বর্তমান কারিগরেরা অবসরে গেলে অনেক দক্ষতা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ধামরাইয়ের কারুশিল্প নিয়ে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রমে আলাদা অংশ যুক্ত করার বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় থাকার কথা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট কারুশিল্পের পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ চালুর সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, কাঁসাশিল্প বাঁচাতে শুধু ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি যথেষ্ট নয়। কারিগরদের সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামাল সংগ্রহে সহায়তা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, আধুনিক নকশা ও পণ্য উন্নয়ন, বাজার সম্প্রসারণ এবং দেশ-বিদেশে বিপণনের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ পেশায় আনা প্রয়োজন।
আধুনিক বাজারের চাহিদার সঙ্গে ঐতিহ্যকে যুক্ত করাও হতে পারে টিকে থাকার অন্যতম পথ। দৈনন্দিন ব্যবহারের পুরোনো নকশার পাশাপাশি আধুনিক বাসাবাড়ির উপযোগী টেবিলওয়্যার, সাজসজ্জার সামগ্রী, উপহারসামগ্রী, করপোরেট উপহার এবং নকশাদার শিল্পকর্ম তৈরি করা গেলে নতুন ক্রেতা তৈরি হতে পারে। অনলাইন বিপণন ও পর্যটনকেন্দ্রিক বিক্রয়ব্যবস্থার সঙ্গেও এই শিল্পকে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
বর্তমানে ধামরাইয়ের কাঁসাশিল্প তাই এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আগুন এখনো জ্বলে, হাতুড়ির আঘাতও শোনা যায়, দক্ষ কারিগরের হাতেও তৈরি হচ্ছে নিখুঁত পণ্য। কিন্তু সেই শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন কারিগরের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে না। একদিকে ঐতিহ্যের স্বীকৃতি ও সরকারি পর্যায়ে সংরক্ষণের আলোচনা, অন্যদিকে বাড়তে থাকা উৎপাদন ব্যয় ও কমে যাওয়া কারিগর—দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে শিল্পটি।
সর্বশেষ পরিস্থিতি বলছে, ধামরাইয়ের কাঁসা-পিতল শিল্প এখনো বিলুপ্ত হয়নি; বরং ক্রমশ সংকুচিত হয়ে বেঁচে আছে। তাই একে ‘বিলুপ্ত’ বলার চেয়ে ‘বিলুপ্তির ঝুঁকিতে’ বলা অধিক বাস্তবসম্মত। এখনই কার্যকর পৃষ্ঠপোষকতা, বাজার সম্প্রসারণ ও নতুন কারিগর তৈরির উদ্যোগ নেওয়া না হলে কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই শিল্পের জ্ঞান, দক্ষতা ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া ভবিষ্যতে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আরও গভীর হতে পারে।